রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধে হোয়াইট হাউজের একতরফা উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। গতকাল রাতভর মধ্য ইউক্রেনের বিভিন্ন অবকাঠামো লক্ষ্য করে রেকর্ডসংখ্যক ড্রোন হামলা চালিয়েছে মস্কো। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সতর্কতা উপেক্ষা করে রুশ জ্বালানি তেল পরিশোধনাগারে হামলা আবারো শুরু করেছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে কিয়েভ। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
আকস্মিকভাবে ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’র ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তবে রাশিয়া কিংবা ইউক্রেন কোনো পক্ষই এটি মেনে নেয়ার কথা জানায়নি। এর মধ্যেই রাশিয়ার অভিযোগ, ইউক্রেন রিয়াজান অঞ্চলে একটি রুশ তেল পরিশোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এটিই ওই স্থাপনায় ইউক্রেনের প্রথম হামলা।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে রুশ তেল পরিশোধনাগারে হামলা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন ট্রাম্প। তার দাবি, ইউক্রেনের এসব হামলার কারণেই বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম বাড়ছে।
এদিকে দানিউব নদীর মোহনায় রোমানিয়ার জলসীমায় দুটি নিরপেক্ষ জাহাজে হামলার ঘটনা বাণিজ্যিক জাহাজের মতো ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা আরো ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকুশোর দান বলেছেন, দুটি রুশ ড্রোন রোমানিয়ার আকাশসীমা লঙ্ঘন করে দুটি রাসায়নিকবাহী ট্যাংকারে আঘাত হানে। এতে জাহাজ দুটিতে আগুন ধরে যায়। নিখোঁজ অন্তত সাত নাবিকের সন্ধানে উদ্ধারকারী দল তল্লাশি চালাচ্ছিল।
তিনি বলেন, ‘কৃষ্ণসাগরের পরিস্থিতি গুরুতর। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো হচ্ছে, সেগুলো ডুবিয়ে দেয়া হচ্ছে। রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার উপকূলের খুব কাছেই নাবিকরা নিহত, আহত ও নিখোঁজ হচ্ছেন। এটি অগ্রহণযোগ্য এবং অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।’
গত বুধবার জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার জ্বালানি তেল পরিশোধনাগারে আবারো হামলা শুরু করবে ইউক্রেন। শান্তি আলোচনায় কিয়েভ যে প্রস্তুত, তা দেখাতে সাময়িকভাবে এসব হামলা বন্ধ রাখা হয়েছিল। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে তিনি বলেন, ‘পরিশোধনাগারে হামলার ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে। আমরা আর তা মানছি না।’ যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে ঘাটতিকেও ‘বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেন তিনি।
রাশিয়ার রিয়াজানের আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থাপনাটি লক্ষ্য করে ৬৯টি ড্রোন ও চারটি ফ্লামিঙ্গো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। মস্কোর দাবি, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গুলিতে ভূপাতিত একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পরিশোধনাগারে আঘাত হানলে আগুন ধরে যায়।
রাশিয়ার সামরিক স্থাপনায়ও পাল্টা আঘাত হেনেছে ইউক্রেন। জেলেনস্কির দাবি, হামলায় রাশিয়ার চারটি সুখোই এসইউ-৩৪ যুদ্ধবিমান ধ্বংস করা হয়েছে এবং আরো দুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় ভরোনেজ অঞ্চলের একটি বিমানঘাঁটিতে নেপচুন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে।
জেলেনস্কি বলেন, ‘এই যুদ্ধবিমানগুলো ইউক্রেনে নতুন করে হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত ছিল এবং সেগুলোয় আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য বোমা বোঝাই করা হয়েছিল।’ ক্ষতিগ্রস্ত বিমানঘাঁটির একটি স্যাটেলাইট ছবিও প্রকাশ করেন তিনি।
ইউক্রেনের মধ্যাঞ্চলীয় কিরোভোহরাদ অঞ্চলে ৩৬০টির বেশি রুশ ড্রোন হামলা চালিয়েছে। রাশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর তুলনায় এখানে আগে হামলার ঘটনা কম ছিল। এসব হামলায় তিনজন নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন।
আঞ্চলিক গভর্নর আন্দ্রি রাইকোভিচ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘শত্রুপক্ষ পরিকল্পিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, পরিবহন প্রতিষ্ঠান, সরবরাহব্যবস্থা-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ও আবাসিক বাড়িঘরে আঘাত হেনেছে।’
জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদারের গতি যখন ‘কৃত্রিমভাবে সীমিত’ করা হচ্ছে, তখন রাশিয়া দেশটিতে ৮৫০টির বেশি শাহেদ ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডের মোবাইল ইন্টারনেট টার্মিনাল ব্যবহারে ইউক্রেনের ওপর আকস্মিক বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সুযোগ পেয়ে এবং ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা দেখে রাশিয়া যে পরিকল্পিতভাবে হামলা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা স্পষ্ট।’
তিনি আরো বলেন, ‘ইউক্রেনের ধারাবাহিক সমর্থন প্রয়োজন, বিশেষ করে আকাশসীমা সুরক্ষার ক্ষেত্রে। এই যুদ্ধ নিয়ে আমাদের অংশীদারদের কাছ থেকে আমরা স্পষ্ট ও অকপট অবস্থান চাই।’
গত সপ্তাহে ট্রাম্প আকস্মিকভাবে ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ‘অবিলম্বে কার্যকর হচ্ছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের মধ্যে জ্বালানি যুদ্ধবিরতি। উভয় পক্ষ এতে সম্মত হয়েছে। এটি ভাঙবেন না!’
তবে ট্রাম্পের এ ঘোষণার পরও ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামোয় ব্যাপক হামলা অব্যাহত রাখে রাশিয়া। গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্য করে হাইপারসনিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে মস্কো। এতে কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যেই আলোচনায় বসতে নিজেদের প্রস্তুতি দেখানোর জন্য সাময়িকভাবে রাশিয়ার জ্বালানি তেল পরিশোধনাগারে হামলা বন্ধ রাখার কথা জানায় ইউক্রেন।
তবে রাশিয়ার কাছে ইউক্রেনকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে জেলেনস্কির ওপর চাপ বাড়ায় হোয়াইট হাউজ। ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহের কর্মসূচি বন্ধ এবং দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধক্ষেত্র-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করার হুমকি দেয় ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি হুমকি বাস্তবায়ন করেছে বলেও মনে হচ্ছে। ইউক্রেন জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে কয়েক দিন ধরে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আগাম সতর্কবার্তা পায়নি তারা। বুধবার ইউক্রেনের সেনারা অভিযোগ করেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন স্টারশিল্ড ব্যবস্থায় তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে। এতে সম্মুখসারিতে ড্রোন অভিযান ব্যাহত হয়েছে।