হরমুজের বিকল্প জ্বালানি পথ গড়ছে উপসাগরীয় দেশগুলো

এখন উপসাগরীয় দেশগুলো এমন ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে হরমুজ মাঝেমধ্যে বন্ধ থাকতে পারে কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য নির্ভরযোগ্য থাকবে না। গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাবে, বিদ্যমান ও পরিকল্পিত বিকল্প রুটগুলো ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ হরমুজ দিয়ে সাধারণত পরিবাহিত তেলের প্রায় ৬০ শতাংশ বহন করতে সক্ষম হতে পারে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে হরমুজ প্রণালিকে মূল অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করছে ইরান। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটি ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের শর্ত নির্ধারণের কৌশলগত সক্ষমতা দেখিয়েছে দেশটি। তবে ইরানের এ কৌশলের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ইরাক ও উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলো এখন হরমুজ এড়িয়ে তেল, গ্যাস ও পণ্য পরিবহনের বিকল্প পাইপলাইন, বন্দর ও করিডোর নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

ইরান সরাসরি প্রণালিটি ভৌতভাবে বন্ধ করেনি। তবে বেসামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে নৌযান চলাচল প্রায় অচল করে দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের একটি ধারণা ভেঙে পড়েছে সংঘাত চললেও হরমুজ আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে সচল থাকবে। এমনকি ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সময়ও প্রণালিটি সচল ছিল।

বর্তমানে হরমুজ দিয়ে কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠানের জাহাজ কোন শর্তে চলতে পারবে তা নির্ধারণ করে দিচ্ছে তেহরান। এ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে বছরে কয়েক হাজার কোটি ডলার ট্রানজিট ফি আদায়ের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে দেশটি। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে জ্বালানির প্রবাহ ও মূল্য নির্ধারণে তেহরানের প্রভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে।

স্বল্পমেয়াদে এ পরিস্থিতিতে ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দীর্ঘ পাল্লার ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও ধ্বংস করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল ও কঠিন। ইয়েমেনের হুথিরা একই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোট বিমান হামলা চালিয়েও সব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ বন্ধ করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতার পর হামলা বন্ধ করে হুথিরা।

তবে দীর্ঘমেয়াদে ইরানের এ কৌশলই দেশটির জন্য বিপরীত ফল বয়ে আনতে পারে। যুদ্ধের আগে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য পরিবহন হতো। ইরাক, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের রফতানির প্রায় একমাত্র পথ ছিল এটি। সৌদি আরব ও ইউএইর জ্বালানি রফতানিরও বড় অংশ এ পথ দিয়ে যেত।

এখন উপসাগরীয় দেশগুলো এমন ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে হরমুজ মাঝেমধ্যে বন্ধ থাকতে পারে কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য নির্ভরযোগ্য থাকবে না। গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাবে, বিদ্যমান ও পরিকল্পিত বিকল্প রুটগুলো ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ হরমুজ দিয়ে সাধারণত পরিবাহিত তেলের প্রায় ৬০ শতাংশ বহন করতে সক্ষম হতে পারে।

সৌদি আরব বর্তমানে পূর্বাঞ্চলের তেল উৎপাদন এলাকা থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবহার করছে। চলমান সংকটে এ রুট দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি করা হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে সক্ষমতা আরো দৈনিক ১০ থেকে ২০ লাখ ব্যারেল বাড়িয়ে মোট ৯০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে রিয়াদ।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে হরমুজের দক্ষিণে একটি বিদ্যমান পাইপলাইন ও বন্দর রয়েছে, যার মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি করা যায়। ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ এ সক্ষমতা দ্বিগুণ করে ৩৬ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

ইরাক পশ্চিমমুখী একাধিক রুট পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে। সিরিয়ার মধ্য দিয়ে ভূমধ্যসাগরমুখী পুরনো পাইপলাইন সংস্কার ও নতুন লাইন নির্মাণে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর কয়েক হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রকল্পগুলো শেষ হলে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ লাখ ব্যারেল তেল পশ্চিমমুখী পথে রফতানি করা সম্ভব হতে পারে।

ইরাক থেকে তুরস্কের জেইহান বন্দর পর্যন্ত কিরকুক-জেইহান পাইপলাইনও আবার গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজনৈতিক বিরোধে বহু বছর আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ থাকা এ রুটের সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল। পাশাপাশি বসরা থেকে পশ্চিম ইরাকের হাদিথা হয়ে জর্ডানের আকাবা বন্দর পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে বাগদাদ ও আম্মান। এ পথে দৈনিক ১০ থেকে ২৫ লাখ ব্যারেল তেল রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলগত দিক স্পষ্ট। তারা একটিমাত্র নৌপথের ওপর নির্ভরশীল না থেকে একাধিক বিকল্প রফতানি ব্যবস্থা তৈরি করতে যাচ্ছে। তারা এমন আঞ্চলিক জ্বালানি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতে হরমুজের গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারে।

আরও