ফিলিস্তিনের গাজার পশ্চিম তীরের হেবরন শহরে সামরিক চৌকিতে বন্দুকধারীদের হামলায় দুই সেনা নিহত ও তিনজন আহতের ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিতে শুরু করেছে ইসরায়েলি সেনারা। সেই সঙ্গে সেখানকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়ার অভিযান শুরু করেছে দেশটি। খবর সিএনএন।
হামলার পর হেবরন শহরে ‘পূর্ণ অবরোধ’ আরোপের ঘোষণা দেয় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও শুক্রবার থেকে পশ্চিম তীরজুড়ে সম্পূর্ণ অবরোধের নির্দেশ দেয়ার কথা জানান। তবে এর কয়েক ঘণ্টা পর নিজের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করে তিনি বলেন, হেবরন ও হালহুল শহর ঘিরে অবরোধ আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। প্রয়োজনে তা অন্য এলাকাতেও সম্প্রসারণ করা হতে পারে।
নেতানিয়াহু আরো বলেন, যে স্থানে হামলার ঘটনা ঘটেছে সেখান থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়ে এলাকাটিকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়া হবে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে জেনিন, তুলকারেম, নুর শামস ও আল-ফারা শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েল যে অভিযান চালিয়েছিল, এবারও একই ধরনের পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। ওই অভিযানে হাজারো ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন এবং পুরো পুরো আবাসিক এলাকা খালি করে দেয়া হয়েছিল।
হেবরনে কয়েক দিনের অভিযান
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও দেশটির নিরাপত্তা সংস্থা (আইএসএ) এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, হেবরন এলাকায় কয়েক দিনব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সন্ত্রাসী অবকাঠামো ও অস্ত্র খুঁজে বের করে ধ্বংস করতে এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাহিনী পুরো এলাকায় নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশি শুরু করেছে। হামলাকারীরা যে এলাকা থেকে অভিযান চালিয়েছিল, আপাতত সেখানেই এ অভিযান সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়।
আইডিএফ ও আইএসএ জানিয়েছে, ওই এলাকার বাসিন্দারা নির্ধারিত তিনটি পথ দিয়ে বের হতে পারবেন। বের হওয়ার সময় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নিরাপত্তা যাচাই করা হবে। যাদের আচরণ বা পরিচয় সন্দেহজনক মনে হবে, তাদের আরো জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে পাঠানো হবে।
এতে আরো বলা হয়, শুক্রবার সকাল থেকে চালানো সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় এ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সন্দেহভাজন হামলাকারীদের বাড়ির মানচিত্র তৈরি, হেবরন ও হালহুলের বিভিন্ন এলাকায় অবরোধ, সড়কে তল্লাশিচৌকি স্থাপন এবং বিভিন্ন স্থানে অভিযান। এ ছাড়া এলাকায় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে—এমন ‘অবৈধ স্থাপনা’ও গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
জোরপূর্বক উচ্ছেদের পরিকল্পনার নিন্দা
এদিকে হেবরনের একটি আবাসিক এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদের পরিকল্পনার নিন্দা জানিয়েছে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি’তসেলেম। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইউলি নোভাক বলেন, ইসরায়েল আগেভাগেই তাদের পরবর্তী অপরাধের ঘোষণা দিচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ হেবরনের একটি ফিলিস্তিনি আবাসিক এলাকা খালি করার এবং পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলের শরণার্থীশিবিরগুলোতে চালানো ব্যাপক উচ্ছেদ ও ধ্বংসযজ্ঞের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর ইচ্ছা ঘোষণা করেছেন।
শুক্রবার বিকালের মধ্যে হেবরনের ফারশ আল-হাওয়া এলাকায় বাড়িঘর ভাঙা শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। সিএনএনের পাওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি আবাসিক ভবনের বাসিন্দাদের উদ্দেশে এক ইসরায়েলি সেনা বলছেন, আপনাদের সরে যাওয়ার জন্য পাঁচ মিনিট সময় দেয়া হচ্ছে।
নেতানিয়াহু বলেন, হেবরনের যে এলাকা থেকে সন্ত্রাসীরা এসেছিল, সেখানেও ঠিক সেটিই করা হবে। বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়া হবে, বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালানো হবে, সেখানে পাওয়া অস্ত্র সরিয়ে নেয়া হবে এবং সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে।
হামলাকারীদের গাড়িতে বিপুল গোলাবারুদ
হামলার সঙ্গে জড়িত অন্য কেউ রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করতে এলাকায় তল্লাশি অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী। আইডিএফ জানিয়েছে, শুক্রবার সকালে দুই বন্দুকধারীকেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনাস্থলের ভিডিওতে ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীদের সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনীর কয়েক মিনিট ধরে গোলাগুলির দৃশ্য দেখা যায়। বারবার গুলির শওব্দ শোনা যায়। রয়টার্সের একটি ভিডিওতে ইসরায়েলের এক উদ্ধারকর্মীকে বলতে শোনা যায়, অন্তত ২০ মিনিট ধরে গোলাগুলি চলছিল এবং আহত ব্যক্তিদের ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিতে উদ্ধারকর্মীদের বেগ পেতে হচ্ছিল।
আইডিএফ জানিয়েছে, হামলায় ব্যবহৃত একটি গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। গাড়িটিতে ‘বিপুল পরিমাণ’ গোলাবারুদ ছিল।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর বলেন, এটি ছিল গুরুতর সন্ত্রাসী হামলা। সেনাদের দ্রুত পদক্ষেপ বড় ধরনের হামলা এবং বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের আরো ক্ষয়ক্ষতি ঠেকিয়েছে। গাড়িতে থাকা গোলাবারুদ আরও বড় পরিসরে হামলা চালানোর জন্য রাখা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, এ ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গ্রেফতারে আরো অভিযান চালানো হবে এবং এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হবে।