হুথি বিদ্রোহীদের হামলা জোরদার হওয়ার মধ্যে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেয়ার অনুমোদন দিয়েছে মিসরের পার্লামেন্ট। গতকাল প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে রিয়াদের আত্মরক্ষায় ‘সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেয়ার অনুমতি দিয়েছেন দেশটির আইনপ্রণেতারা। এর ফলে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতে মিসর আরো সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে। খবর রয়টার্স।
এর আগে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৌদি আরব সহায়তা চাইলে সামরিক সমর্থন দেয়ার জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদন চেয়েছিলেন সিসি। হুথিদের অগ্রযাত্রা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির জন্যও হুমকি তৈরি করছে। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ এ প্রণালি মিসরের সুয়েজ খালের সঙ্গে বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের সংযোগ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পার্লামেন্টের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য প্রস্তাবটির পক্ষে ছিলেন। তবে রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে ভোটাভুটি হওয়ায় ভোটের বিস্তারিত ফল প্রকাশ করা হয়নি। সৌদি আরবও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে মিসরের সেনা চায়নি।
মিসর কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেবে, সে বিষয়ে বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি। পার্লামেন্টের আইনবিষয়ক কমিটির উপপ্রধান তাহের আল-খুলি বলেছেন, সৌদি আরবের অনুরোধে এবং দুই দেশের সমন্বয়ের ভিত্তিতে মিসর সেখানে সেনা পাঠাবে।
তবে মিসরের কয়েকটি বিরোধী দল এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে অথবা সমর্থন দেয়া থেকে বিরত থেকেছে। বিরোধী দলগুলোর জোট সিভিল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট আঞ্চলিক যুদ্ধে মিসরের সামরিক অংশগ্রহণ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, কায়রোর ভূমিকা হওয়া উচিত মধ্যস্থতায় সীমাবদ্ধ রাখা।
মিসরীয় সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি জানিয়েছে, অভিযানের উদ্দেশ্য, মেয়াদ ও ব্যয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় তাদের আইনপ্রণেতারা ভোটদানে বিরত থাকবেন। তবে দলটি সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরান ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলার নিন্দা জানিয়ে আসছে মিসর। তবে দেশটি এখন পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি। গত আগস্টে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতেও যোগ দেয়নি কায়রো।
চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর মন্ত্রীরা চলতি মাসের শুরুতে রিয়াদে জরুরি বৈঠক করেন। সেখানে সৌদি আরবে দ্রুত সেনা ও সামরিক সক্ষমতা মোতায়েন নিশ্চিত করার বিষয়ে একমত হন তারা। গত সপ্তাহে পাকিস্তান চুক্তিটি অনুমোদন করেছে। একই সময়ে তুরস্কের পার্লামেন্টেও চুক্তিটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংঘাত কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে গতকাল চুক্তিভুক্ত তিন দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা তেহরানে ইরানি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন।
এদিকে গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, হুথিদের আকাশপথে হামলা থেকে সৌদি আরবের শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় রয়্যাল এয়ার ফোর্সের টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হবে।
সৌদি আরবকে সহায়তার সীমা নির্ধারণ সিসির
গত সপ্তাহে মিসরের পার্লামেন্টে প্রস্তাবটির ওপর ভোটাভুটি স্থগিত করা হয়েছিল। ওই সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি ও গোয়েন্দাপ্রধান হাসান রাশাদ সৌদি আরব সফর করেন। তারা সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের কাছে সিসির একটি চিঠি পৌঁছে দেন। চিঠিতে সিসি জানান, মিসরের সহায়তা সৌদি আরবের ভূখণ্ড ও সীমান্ত রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে; ইয়েমেনে হামলা চালানোর জন্য নয়।
সফর শেষে আবদেলাত্তি বলেন, ইয়েমেন সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানে সম্ভাব্য সব পথ খতিয়ে দেখার পক্ষে মিসর।
মিসরের সিনেটের স্পিকার ইসাম ফারিদও জানিয়েছেন, দেশটির অবস্থান পুরোপুরি প্রতিরক্ষামূলক। সৌদি আরবের ভূখণ্ড, সীমান্ত, সার্বভৌমত্ব ও পবিত্র স্থানগুলোকে বাইরের হামলা থেকে রক্ষা করাই এর উদ্দেশ্য। ইয়েমেনে হামলা চালানোর জন্য এ সহায়তা ব্যবহার করা হবে না। তার ভাষায়, মিসর তার ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর পাশে থাকবে ‘আক্রমণকারী তলোয়ার হিসেবে নয়, বরং সুরক্ষাদানকারী ঢাল হিসেবে’।
আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ মিসরের অন্যতম বৃহৎ সামরিক বাহিনী রয়েছে। ২০১৫ সালের মার্চে ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছিল দেশটি। ওই সময় মূলত নৌবাহিনীর মাধ্যমে লোহিত সাগরের নৌপথের নিরাপত্তায় সহায়তা করে মিসর। পাশাপাশি প্রায় ৮০০ স্থলসেনা মোতায়েন করলেও সরাসরি যুদ্ধে তাদের ভূমিকা ছিল সীমিত।
১৯৬০-এর দশকে ইয়েমেনে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছিল মিসর। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর দেশটি আর বড় পরিসরে বিদেশে স্থলসেনা মোতায়েন করেনি।
গত সপ্তাহে হুথি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের পার্লামেন্টের স্পিকার ইয়াহিয়া আলী আল-রাই মিসরের পার্লামেন্টকে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানান। তার বক্তব্য, এতে মিসরের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শুরা কাউন্সিলের প্রধান আহমেদ ওবেইদ বিন দাগর সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় মিসরের অংশগ্রহণের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।