ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হামলার পর পাল্টা জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেহরান। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার মার্কিন হামলায় দক্ষিণ ইরানের সিরিক শহরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে পাঁচজন নিহত হওয়ার পর এ হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী। খবর বিবিসি, রয়টার্স।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, মঙ্গলবার সিরিকের একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ছিটকে আসা ধ্বংসাবশেষে পাঁচজন নিহত হন। তাদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫০ জনের বেশি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাম্প্রতিক হামলার চেষ্টার পর ইরানে হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক সামরিক সরঞ্জাম, মাইন স্থাপনের সক্ষমতা এবং যোগাযোগ অবকাঠামো।
হামলার প্রতিক্রিয়ায় আইআরজিসি বলেছে, এ হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুতপ্ত হতে হবে। ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, সিরিকে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে বুধবার ভোরে জর্ডানের আকাবায় মার্কিন মেরিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান।
এদিকে জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি ধ্বংস করা হয় এবং তিনটি প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে পড়ে। এ হামলায় কোনো হতাহত হয়নি। এর আগে আকাবা ও মাফরাক প্রদেশের বাসিন্দাদের ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ার বিষয়ে সতর্ক করেছিল জর্ডানের জাতীয় নিরাপত্তা কেন্দ্র। পরে সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।
একইদিন ভোরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করার কথা জানিয়েছে কুয়েতের সেনাবাহিনী। ইরানের হামলার পর বাহরাইনেও কয়েকটি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। বাহরাইন জানিয়েছে, ইরানের কয়েকটি ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে।
এছাড়া উত্তর ইরাকের এরবিলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি। এতে কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা। তবে ইরাক বা যুক্তরাষ্ট্র—কোনো পক্ষই এ হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
লারাকে হামলার পর ফের সংঘাত
দীর্ঘ বিরতির পর চলতি সপ্তাহের শুরুতে হরমুজ প্রণালির লারাক দ্বীপে দুটি রকেট উৎক্ষেপণস্থলে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে জর্ডানের বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি ড্রোন হামলা চালায় ইরান।
এর জবাবে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকালে নতুন করে হামলার ঘোষণা দেয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরান পাল্টা হামলা চালালে দেশটির ওপর আরো ‘কঠিন ও বড় মাত্রার’ হামলা হবে। এমনকি ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের হামলা করার প্রস্তুতি রয়েছে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
পরে সেন্টকম জানায়, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ১২টায় ইরানের আইআরজিসির বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করে মার্কিন বাহিনী। বুধবার ভোরের মধ্যেই অভিযান শেষ হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, চাবাহার ও কোনারাক এলাকায় এবং জিরফত শহরের একটি বিমানবন্দরে প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে। কেশম দ্বীপ ও বান্দার আব্বাসেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
সেন্টকমের মুখপাত্র মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বিবিসিকে বলেন, সিরিকে হামলায় বেসামরিক নাগরিক হতাহত হওয়ার বিষয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন সম্পর্কে তারা অবগত। তিনি বলেন, আইআরজিসির মতো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কখনো বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন উদ্বেগ
রয়টার্স বলছে, যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রতি পাঁচ ব্যারেলের একটি এ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হত। সংঘাতের কারণে প্রণালিতে নৌ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা চলছে।
মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ ডলারের বেশি বেড়ে পাঁচ সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে। আইআরজিসি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা হরমুজ প্রণালিতে চলাচল আরো কঠিন করে তুলবে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম বলেছে, ইরান যদি পারস্য উপসাগর থেকে তেল রফতানি করতে না পারে, তাহলে অন্য কারো পক্ষেও সেখান থেকে তেল রফতানি সম্ভব হবে না।
এর আগে সোমবার হরমুজ প্রণালি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা দুটি ট্যাংকারে হামলার খবর আসে। এরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরো বেড়ে যায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক হামলা শুরু করে। জবাবে ইরান ইসরায়েল, মার্কিন ঘাঁটি ও উপসাগরীয় মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এতে হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এরপর জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর লক্ষ্যে ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে এর মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় আবারও সংঘাত শুরু হয়।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তেহরানের দাবি, ইরানের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করা হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ কার্যকর করছে।
সেই ধারাবাহিকতায় গত ২৪ আগস্ট ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয় ওয়াশিংটন। এর লক্ষ্য তেহরানকে আরো বিচ্ছিন্ন করা এবং দেশটির মিত্রদের ওপর পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়ানো। এ বিষয়ে জি-২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র প্রয়োজনীয় সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে নতুন নিষেধাজ্ঞাকে আগের মার্কিন অর্থনৈতিক পদক্ষেপেরই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছে ইরানের কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যর্থতার পরই ওয়াশিংটন এ ধরনের অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
সবশেষ মঙ্গলবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানকে উদ্ধৃত করে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আবার চুক্তির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হলে ইরানও চুক্তি মেনে চলবে।