গাজাগামী ফ্লোটিলা আটক, গ্রেটাসহ শত শত কর্মী ইসরায়েলের হেফাজতে

সব মিলিয়ে ফ্লোটিলার অন্তত ১৩টি জাহাজ সমুদ্রে আটক করা হয়েছে। 'গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা'র মুখপাত্র সাইফ আবুকেশেখ জানান, এসব জাহাজে ৩৭টি দেশের ২০১ জনেরও বেশি মানুষ ছিলেন। এদের মধ্যে স্পেনের ৩০ জন, ইতালির ২২ জন এবং তুরস্কের ২১ জন কর্মী ছিলেন।

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় ইসরায়েলের আরোপিত অবরোধ ভাঙার বৃহত্তর নৌ-সাহায্য মিশনের অংশ হিসেবে যাত্রা শুরু করা 'গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা'-র একাধিক জাহাজ আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ৪০টিরও বেশি বেসামরিক জাহাজ এবং প্রায় ৫০০ জন কর্মীকে নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই ফ্লোটিলা বিশ্বজুড়ে নজর কেড়েছিল। ইসরায়েল এই অবরোধকে ‘বৈধ নৌ অবরোধ’ দাবি করে জাহাজগুলোকে গাজায় পৌঁছতে না দেয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। খবর আল জাজিরা।

বুধবার রাতে আসলে কী ঘটেছে

ফ্লোটিলার আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি নৌবাহিনী বুধবার রাতে এই সাহায্যবাহী নৌবহরের জাহাজগুলো আটক করে। গাজার উপকূল থেকে প্রায় ৭০ নটিক্যাল মাইল (১৩০ কিলোমিটার) দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি নৌ সেনারা জাহাজগুলোতে প্রবেশ করে।

ফ্লোটিলা গাজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় ইসরায়েলি বাহিনী জাহাজগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং সিগন্যালে জ্যাম তৈরি করে।

সব মিলিয়ে ফ্লোটিলার অন্তত ১৩টি জাহাজ সমুদ্রে আটক করা হয়েছে। 'গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা'র মুখপাত্র সাইফ আবুকেশেখ জানান, এসব জাহাজে ৩৭টি দেশের ২০১ জনেরও বেশি মানুষ ছিলেন। এদের মধ্যে স্পেনের ৩০ জন, ইতালির ২২ জন এবং তুরস্কের ২১ জন কর্মী ছিলেন।

আটক হওয়া জাহাজে সুইডেনের পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও ছিলেন। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি ভিডিও প্রকাশ করে নিশ্চিত করেছে যে, গ্রেটা এবং তার বন্ধুরা নিরাপদে ও সুস্থ আছেন এবং তাদের ইসরায়েলি বন্দরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আয়োজকরা জানিয়েছেন, এখনো প্রায় ৩০টি জাহাজ সামরিক জাহাজ থেকে দূরে থেকে গাজার উপকূল থেকে প্রায় ৮৫ কিমি (৪৬ নটিক্যাল মাইল) দূরে নিজেদের পথ তৈরি করার চেষ্টা করছে।

ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েল শুরু থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে, তারা এই নৌবহরকে গাজায় পৌঁছতে দেবে না। কারণ তাদের মতে এটি 'বৈধ নৌ অবরোধ' ভাঙার চেষ্টা।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেখানে নৌবাহিনীর একজন প্রতিনিধি ফ্লোটিলাকে সতর্ক করছেন যে, তারা একটি 'সীমাবদ্ধ, অবরুদ্ধ এলাকার' কাছাকাছি চলে এসেছে। তিনি জানান, গাজার জন্য যেকোনো সাহায্য অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত চ্যানেলের মাধ্যমে পাঠাতে হবে।

ফ্লোটিলার একটি জাহাজ। ছবিটি গত সপ্তাহের। ছবি- রয়টার্স

ইসরায়েলের জাতিসংঘ দূত ড্যানি ড্যানন জানিয়েছেন, আটক হওয়া কর্মীরা ইয়াম কিপ্পুর ইহুদি উৎসব শেষ হওয়ার পর (বৃহস্পতিবারের পরে) নির্বাসিত হবেন। ইয়াম কিপ্পুর ছুটির কারণে ইসরায়েলে আদালত এবং কারাগারগুলো প্রায় অচল। যার ফলে আটক কর্মীদের আইনি প্রক্রিয়ায় কিছুটা জটিলতা তৈরি হতে পারে।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, কিছু ফ্লোটিলা আয়োজকের সঙ্গে হামাসের যোগসূত্র রয়েছে। যদিও এই দাবির সপক্ষে তারা কোনো প্রমাণ দেয়নি এবং কর্মীরা তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

অবরোধ ও আন্তর্জাতিক আইনের বিতর্ক

২০০৭ সালে হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর থেকেই ইসরায়েল গাজায় কম-বেশি অবরোধ আরোপ করে আসছে। ইসরায়েল ২০০৯ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌ অবরোধ কার্যকর করেছে। তাদের দাবি, অস্ত্র চোরাচালান রোধ করার জন্য এ অবরোধ প্রয়োজনীয়।

তবে অবরোধের সমালোচকরা একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর 'সম্মিলিত শাস্তি' হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ফ্লোটিলার আয়োজকরাও ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবৈধ হস্তক্ষেপ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছেন। তাদের মতে, তারা শুধুমাত্র প্রতীকী পরিমাণ মানবিক সাহায্য নিয়ে গাজায় একটি সমুদ্র করিডোর স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল।

২০০৭ সাল থেকে গাজা কার্যত একটি খোলা কারাগারের মতো, যেখানে অবরোধের কারণে লাখো মানুষ আটকে আছেন। এই ফ্লোটিলা অভিযান কেবল মানবিক সাহায্যের প্রশ্ন নয়, বরং গাজার ওপর দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ককে আবারো সামনে নিয়ে এসেছে।

আরও