দুর্গত বহু এলাকায় উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় প্রাণহানি আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল রাত পর্যন্ত দুই দেশে ১ হাজার ৪৬৮ জন নিখোঁজ ছিলেন। তাদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের পর্যটক, পর্বতারোহী, তীর্থযাত্রী ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীরা রয়েছেন। বুধবার কয়েক তলা ভবনের সমান উঁচু পানি, বরফ, কাদা ও পাথরের স্রোত সীমান্তবর্তী জনপদগুলোর ওপর আছড়ে পড়ে। এতে বহু গ্রাম নিশ্চিহ্ন হওয়ার পাশাপাশি সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সীমান্ত অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। দুর্গত এলাকায় গতকাল দিনভর সামরিক হেলিকপ্টার ও উদ্ধারকারী দল নিখোঁজদের সন্ধান করেছে। তবে সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে দুই দেশের সীমান্তে নতুন করে সৃষ্টি হওয়া দুটি হ্রদ ভেঙে আবারো ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খবর এপি ও বিবিসি।
নেপাল পুলিশের সর্বশেষ হিসাবে, গতকাল রাত পর্যন্ত দেশটিতে ৩৮৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৯১০ জন। অন্যদিকে তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে তিনজনের মৃত্যু ও ৫৫৮ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। দুর্গত প্রত্যন্ত এলাকাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় হতাহত ও নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে রেডক্রস।
বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের উঁচু পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ার পর সেগুলো নদীর পানির সঙ্গে মিশে বিশাল ধ্বংসস্রোতে পরিণত হয়। পথে হিমবাহের মোরেইন বা সঞ্চিত পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষ যুক্ত হওয়ায় স্রোতটি আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। চীনের সরকারি ভূতাত্ত্বিক গুও ঝাওচেং জানিয়েছেন, বরফ, পাথর ও কাদার স্রোতটি সেকেন্ডে প্রায় ৫০ মিটার গতিতে ২০ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করে। ফলে সামনে থাকা মানুষের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য কার্যত কোনো সময়ই ছিল না।
দুর্যোগের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার উত্তরে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প শনাক্ত করার কথা জানিয়েছিল। পরে সংস্থাটি জানায়, সেটি ভূমিকম্প ছিল না; হিমবাহ, পাথর ও বরফের বিশাল অংশ ধসে পড়ার ফলে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য কম্পন সৃষ্টি হয়েছিল। কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, হিমবাহ থেকে নেমে আসা তুষারধসই আকস্মিক বন্যার সম্ভাব্য কারণ। তাদের হিসাবে, ত্রিশূলী নদীর একটি স্থানে মাত্র আধা ঘণ্টায় পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে গিয়েছিল।
বন্যার সময় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, পানি ও কাদার বিশাল দেয়াল এগিয়ে আসার সময় মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্রোত তাদের গ্রাস করে এবং ভবন, গাড়ি ও সেতু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নুয়াকোট জেলার অনেক ভবনের দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত কাদায় ঢেকে গেছে। নদীর তীর ও গ্রামের সড়কে পুরু কাদা জমেছে। গাছের ডাল ও বৈদ্যুতিক তারে ঝুলছে ধ্বংসাবশেষ; অসংখ্য গাড়ি কাদার নিচে চাপা পড়েছে। বন্যা থেকে বেঁচে যাওয়া অনেক মানুষকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাদায় মাখা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
নেপালি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্যায় কয়েক ডজন সেতু ধ্বংস এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে স্থলপথে উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণ পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নেপালের সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করেছে। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোয় আটকে পড়া লোকজনকেও সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আহত কয়েক ডজন মানুষকে চিকিৎসার জন্য রাজধানী কাঠমান্ডুতে পাঠানো হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ত্রিশূলী অঞ্চল থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের সমতলভূমি চিতওয়ানেও নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
পাহাড়ি অঞ্চল থেকে অনেক মরদেহ নদীর স্রোতে বহু দূর ভাটিতে চলে গেছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের সমতলভূমি চিতওয়ান জেলার নদী ব্যবস্থায় ১০৩টি মরদেহ পাওয়া গেছে। চিতওয়ানের প্রশাসক গণেশ আরিয়াল জানিয়েছেন, স্থানীয় হাসপাতালগুলোর মর্গে সব মরদেহ রাখার জায়গা নেই। তাই অস্থায়ী তাঁবু স্থাপন এবং স্বজনদের মাধ্যমে মরদেহ শনাক্ত করার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। নেপাল রেডক্রস সোসাইটির চেয়ারম্যান বিশাল কুমার ভাণ্ডারি জানিয়েছেন, কিছু এলাকায় তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি এখন বড় পরিসরে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অন্তত তিনটি গ্রামের প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তবে পুরোপুরি ধ্বংস হওয়া ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোর ক্ষয়ক্ষতি এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।
বন্যা থেকে বেঁচে যাওয়া ৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বারাল বলেন, ‘বিশাল কাদার স্রোত তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছিল এবং যত কাছে আসছিল ততই উঁচু হচ্ছিল। স্ত্রীকে নিয়ে ছাদে ওঠার চেষ্টা করলেও কাদার স্রোত তার স্ত্রীকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।’ ৪ ঘণ্টা পর হেলিকপ্টারে বারালকে উদ্ধার করা হয়। তার স্ত্রী এখনো নিখোঁজ। নুয়াকোটের বিদুরে শোভা শ্রেষ্ঠা নামে আরেক নারী একদিনের বেশি সময় ধরে স্বামী রাজনের সন্ধান করছেন। বন্যার পর প্রথম দিকে তার ফোনে সংযোগ পাওয়া গেলেও পরে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। বিদুরে প্রতিটি হেলিকপ্টার নামার সময় স্বামী ফিরে আসবেন—এমন আশায় অপেক্ষা করছেন তিনি।
নিখোঁজদের বড় একটি অংশ বিদেশী নাগরিক। নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, দেশটিতে নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫১৭ জন বিদেশী। তিব্বতে নিখোঁজ ৫৫৮ জনের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশী নাগরিক বলে জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে ৩০টির বেশি দেশের নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশটির ২৮৮ নাগরিকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, নেপাল ও চীনে ৯০ মার্কিন নাগরিকের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি; তিনজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইউক্রেন, জাপান, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।
বিদেশী নিখোঁজদের অনেকেই তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন। হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের কাছে কৈলাস পর্বত পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত। ভারতীয় আধ্যাত্মিক গুরু সদগুরু জাগ্গি বাসুদেব জানিয়েছেন, তার নেতৃত্বাধীন একটি তীর্থযাত্রী দলের ৭৭ সদস্য সীমান্তের অভিবাসন কার্যালয়ে অবস্থান করার সময় বন্যার কবলে পড়েন। তাদের মধ্যে ২২ জন মার্কিন নাগরিকসহ বিভিন্ন দেশের মানুষ রয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত তাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
তিব্বতের গিরং স্থলবন্দর এলাকায় কাদা ও পাথরের স্রোত একটি বহুতল ভবন গ্রাস করেছে। আশপাশের এলাকায় গড়ে দেড় মিটারের বেশি পুরু কাদা জমেছে। সীমান্তের দিকে যাওয়া সব সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে গতকাল চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং পৌঁছে উদ্ধারকাজ তদারক করেন। সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর প্রায় ৫০০ সদস্য উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। হেলিকপ্টার থেকে জীবিতদের সন্ধান, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং উদ্ধার ও সরিয়ে নেয়ার সম্ভাব্য পথ চিহ্নিত করা হচ্ছে।
এর মধ্যেই নতুন বন্যার আশঙ্কা উদ্ধার তৎপরতাকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। নেপালে ধ্বংসাবশেষ জমে ভোতেকোশি নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে। পানির উচ্চতা বাড়তে থাকায় হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে। নদীর নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দা, যাত্রী ও উদ্ধারকর্মীদের নদীর তীর ছেড়ে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলেছে নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। সতর্কতা পাওয়ার পর কয়েকটি উদ্ধারকারী দলও নদীর তলদেশ থেকে উঁচু এলাকায় অবস্থান নিয়েছে।