বিক্ষোভকারীদের যন্তর মন্তর থেকে দূরে রাখতে চায় ভারত সরকার। আজ সকালেও তেমনটা দেখা গেল। গতকালের মতোই দিল্লি মেট্রোর একাধিক স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) সামাজিক মাধ্যমে লিখেছে, ‘মেট্রো স্টেশন বন্ধ করার এই প্রতিদিনের নাটক কেন? আপনারা যা-ই করুন না কেন, মানুষ যন্তর মন্তরে আসতেই থাকবে।’ খবর বিবিসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল রাতে সিজেপির বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে, কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোঁড়ে পুলিশ। অন্যদিকে, পুলিশকে লক্ষ্য করেও পাথর ছোঁড়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার সন্ধ্যা থেকেই দিল্লির যন্তর মন্তরের চারপাশে বিক্ষোভকারীদের ভিড় ক্রমে বাড়তে শুরু করে। এক পর্যায়ে ভিড় টলস্টয় মার্গ এবং পার্লামেন্ট স্ট্রিট পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
ভারতীয় সংবাদপত্রগুলোয় লেখা হয়েছে যে মূল জমায়েতের এলাকা দুদিক থেকে লোহার বেড়া দিয়ে কিছুটা ছোটো করে দিয়েছিল পুলিশ, তাই অনেক বিক্ষোভকারীই মূল মঞ্চের দিকে না যেতে পেরে নানা জায়গায় ছোটো ছোটো জমায়েত করছিলেন।
এই জমায়েতগুলো ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সন্ধ্যায় কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে এবং লাঠিচার্জ করে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। এসময় পাল্টা আক্রমণ করা হয় এবং তাদের লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়া হয় বলে অভিযোগ করেছে পুলিশ।
আজ সকালেও যন্তর মন্তরে বহু বিক্ষোভকারী হাজির রয়েছেন, অন্যদিকে পুলিশ এবং দাঙ্গাদমন বাহিনী 'র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স' এর সদস্যরাও হাজির রয়েছেন সেখানে। বুধবারের মতোই বৃহস্পতিবারও দিল্লি মেট্রোর একাধিক স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে।
মেট্রো স্টেশন বন্ধ করার বিষয়ে সিজেপি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছে, ‘মেট্রো স্টেশন বন্ধ করার এই প্রতিদিনের নাটক কেন? আপনারা যা-ই করুন না কেন, মানুষ যন্তর মন্তরে আসতেই থাকবে।’
আজ সকালেই এক সংবাদ সম্মেলনে 'ককরোচ জনতা পার্টি'র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং অন্যান্য বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন যে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তাদের আন্দোলন চলবে।
এরই মাঝে সকালে সামাজিক মাধ্যমে বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ভারতের যুবসমাজের প্রশংসা করে তিনি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার বিচার ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে করার আশ্বাস দেন।
ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভকারীদের উপরে পুলিশের লাঠিচার্জ নিয়ে বুধবারই দিনের বেলায় শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপের আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই মামলা শুনতে রাজি হননি প্রধান বিচারপতি। জরুরি আর্জির আবেদন খারিজ করে দেয়া হয়।
অন্যদিকে সরকারের তরফে এই আন্দোলন বিরোধীদের মদতপুষ্ট বলে অভিযোগ তোলা হয়।
আজ সকালে সাংবাদিকদের অভিজিৎ দীপকে বলেছেন, ‘লাঠিচার্জের ঘটনাটা খুবই নৃশংস ছিল এবং যে পুলিশ কর্মকর্তারা লাঠি চালিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে আমরা আদালতে যাবো।’
তিনি বলেন, ‘আজ আমাদের প্রতিবাদের ৩৪তম দিন। সোনম স্যারের (সোনাম ওয়াংচুক) অনশন চলছে। আজ তার অনশনের ২৬তম দিন, তাই আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের প্রতিবাদ চলবে। কিন্তু আমরা সোনম স্যারকে তার অনশন শেষ করার অনুরোধ করছি, কারণ আমরা তাকে হারাতে চাই না।’
ছবি: রয়টার্স
সিজেপির প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস জানিয়েছেন যে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের বিষয়ে কোনো আপস হবে না।
তিনি বলেছেন, ‘আমি আজ সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে বেশ কয়েকবার কথা বলেছি। তিনিও বিক্ষোভকারীদের শান্তি বজায় রাখতে এবং সঠিক পদ্ধতিতে এই প্রতিবাদ পরিচালনা করার জন্য আবেদন করেছেন। এই দেশে আগে যে আন্দোলন হয়েছে সেখানে প্রতিবাদগুলোয় শাসক দল সমাজবিরোধীদের অনুপ্রবেশ করিয়েছিল এবং তারপরে আন্দোলনের ওপর দোষ চাপানো হয়েছিল। এমনটা যেন না হয়।’
গতকাল সাংবাদিক সম্মেলন করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা। সেখানে তিনি অভিযোগ করেছিলেন, বিরোধী দলগুলো এই আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক ফায়দা নিচ্ছে।
সেই প্রসঙ্গে সৌরভ দাস আজ বলেন, ‘জে পি নাড্ডার লজ্জা হওয়া উচিত। মানুষ এখানে ৩০ দিনেরও বেশি সময় ধরে বসে আছেন এবং বলছেন যে কোনো রাজনীতি চলবে না। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের বিষয়ে কোনো আপস হবে না; তাকে যেতেই হবে। ততদিন পর্যন্ত এই প্রতিবাদ চলবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আলোচনার জন্য প্রস্তুত। একটা পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা হোক। এই গভীর আলোচনার জন্য সংসদই সঠিক জায়গা। আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করতে হবে, কারণ শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। এটা সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই দায়িত্ব।’
এদিকে বুধবার রাতের লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেল ছোঁড়ার ঘটনায় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলার অভিযোগ তুলেছে পুলিশ।
এসিপি (পাঞ্জাবী বাগ) জয় প্রকাশ বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেছেন, ‘আমি যন্তর মন্তরের কাছে ধর্নাস্থলে ছিলাম সকাল সাতটা থেকে। আন্দোলনকারীরা স্লোগান দিচ্ছিলেন এবং ডিস্টার্বেন্স তৈরি করছিলেন।’
‘বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অনেকে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে যেতে থাকলে আমরা তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করি। আমরা মানবশৃঙ্খল এবং ব্যারিকেড তৈরি করি। কিন্তু হঠাৎ পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও বোতল ছুঁড়তে থাকেন বিক্ষোভকারীদের একাংশ। তারই একটা পাথর এসে আমার মাথায় লাগে।’
সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা- ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এনট্রান্স টেস্ট বা নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়া এবং তার জেরে অন্তত ২০ জন পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার দায় নিয়ে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে দিল্লিতে একমাসেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন চলছে।
এর সমর্থনে মুম্বাই, কলকাতা, গুজরাত, তামিলনাডু, বিহারের পাটনাসহ, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ দেখা গেছে।
আন্দোলনরতদের সমর্থনে কথা বলেছেন শাবানা আজমি, নাসিরুদ্দিন শাহ, অরিজিত সিং-সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি।
গতকাল বিহারের রাজধানী পাটনায় অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা)-এর বিক্ষোভকারীরা রাজভবনের দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে তাদের থামাতে পুলিশ জল-কামান, কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে।
মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্ক, চৈত্যভূমি, চেম্বুর-সহ বিভিন্ন জায়গায় সিজেপির সমর্থনে সমাবেশ হয়েছে গত কয়েকদিনে। পুলিশের অনুমতি ছাড়াই এই সমাবেশ করা হচ্ছে- এই অভিযোগ ধরাপাকড়ও চলছে।
কলকাতাতেও বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ কর্মসূচি দেখা গেছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি বিশ্বিবিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা দিল্লিতে আন্দোলনরতদের পক্ষে প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন। পরবর্তী কয়েকদিনেও নানা কর্মসূচির কথা জানিয়েছে বিভিন্ন ছাত্র-যুব সংগঠন।
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চেয়ে সিজেপির এই বিক্ষোভ যে অরাজনৈতিক তা বার বার বলেছেন অভিজিৎ দীপকে। তবে ধর্ণা মঞ্চে তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের স্বাগতও জানিয়েছেন। ফলে শাসকদলের প্রশ্নের মুখে পড়েছে এই আন্দোলন।
সোনাম ওয়াংচুকের অনশন এই মঞ্চে চলাকালীন সিজেপির বিক্ষোভে এসেছিলেন আপের নেত্রী অতিশী, সিপিআইএমের জেনারেল সেক্রেটারি এমএ বেবি, এছাড়াও ছিলেন বৃন্দা কারাত, সৃজন ভট্টাচার্যরা। তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মৈত্রও দেখা করেছেন অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে।
সম্প্রতি সমাজবাদী পার্টির ডিম্পল ইয়াদভ, আরজেডি থেকে মনোজ ঝা ও মহারাষ্ট্রের বিরোধী দল শিবসেনা (উদ্ধবপন্থি)-র নেতা উদ্ধব ঠাকরেও এই বিক্ষোভের এই দলের ধর্ণা কর্মসূচিতে এসেছিলেন এবং তাদের সমর্থন জানিয়েছেন।