নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদে ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে চমক দেখিয়েছেন ৩৩ বছর বয়সী জোহরান মামদানি। ক্যামেরায় ধরা পড়েছে—শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে শুরু করে রাত ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত এই ডেমোক্র্যাট সমাজতন্ত্রী হেঁটেছেন গোটা ম্যানহাটনের রাস্তাজুড়ে। তাকে অভিবাদন জানিয়েছেন চলতি পথের নিউইয়র্কবাসীরা। কেউ বলছেন ‘আগামী মেয়র’, কেউ বা হাততালি দিচ্ছেন। মামদানির ভাষায়, ‘নিউইয়র্কবাসী এমন একজন মেয়র চান যাকে তারা দেখতে, শুনতে এবং প্রয়োজনে বকাও দিতে পারবেন।‘
তার এই অনানুষ্ঠানিক, অকপট রাজনৈতিক স্টাইল অনেকটাই ভিন্ন গতানুগতিক রাজনীতিকদের চেয়ে। সামাজিকমাধ্যমে প্রথাগত বক্তব্যের বদলে উঠে আসে তার সরল ও অনেকটাই মানবিক উপস্থিতি। আর এই কৌশলেই তিনি গড়ে তুলেছেন এক বিশাল সমর্থকভিত্তি। এছাড়া, অন্য যে কারণে মামদানি তরুণ ভোটারদের প্রবলভাবে আকৃষ্ট করতে পেরেছেন তা হলো গাজা প্রশ্নে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান। গাজায় অব্যাহত ইসরায়েলের হামলাকে মামদানি খোলামেলাভাবেই ‘গণহত্যা’ বলেছেন। তার এই অবস্থানকে শহরের প্রথাগত রাজনীতিকরা ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ বলেছেন।
নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট মামদানির প্রতিশ্রুতি ছিল—নিউইয়র্ক শহরকে নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য অধিক বসবাসযোগ্য করে তোলা। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কম মূল্যের মুদিদোকান খোলা, বিনা ভাড়ার সরকারি বাস, বিনা খরচে শিশু পরিচর্যা, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য নতুন দুই লাখ অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ ও ভাড়ানিয়ন্ত্রিত অ্যাপার্টমেন্টে আগামী চার বছর ভাড়া বাড়ানো নিষিদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মামদানি। এ জন্য শহরের ধনী ব্যক্তিদের ওপর অতিরিক্ত আয়কর আরোপের মাধ্যমে আট বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
জনমত গবেষক ফ্রাঙ্ক লান্টজ বলছেন, মামদানির এই জয় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জন্য বড় এক বার্তা। তার মতে, শুধু অ্যান্ড্রু কুয়োমোই হারলেন না বরং চূড়ান্তভাবে পরাজিত হলেন সিনেট সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার ও প্রতিষ্ঠানপন্থী ডেমোক্র্যাটরা। ট্রাম্পের যুগে জনগণ রাজনৈতিকভাবে আরো আদর্শবাদী ও সরাসরি ভাষায় নীতিকথা চাচ্ছেন বলেও মত দেন লান্টজ। কুইন্সের আস্টোরিয়া থেকে স্টেট অ্যাসেম্বলি সদস্য মামদানিকে তার ‘ফ্রি পাবলিক বাস’ ও ‘সিটিচালিত মুদিদোকান’-এর মতো প্রস্তাব নিয়ে উপহাস করা হলেও তিনি স্পষ্টভাবেই তরুণ ভোটারদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছেন।
প্রচলিত দানশীল বা বিখ্যাত নাম না থাকলেও মামদানি সামাজিকমাধ্যমে নিয়মিত ইতিবাচক ও বিনোদনমূলক কনটেন্ট দিয়ে নিজের বার্তা ছড়িয়েছেন। টিকটক ও এক্সে তার বিতর্কে কুয়োমোকে আক্রমণের ভিডিও মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ হয়েছে। ৫০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক দরজায় দরজায় গিয়ে প্রচার চালিয়েছেন, আবার ছোট অনুদানে তহবিল গঠনে রেকর্ডও গড়েছেন।
তরুণ ভোটার, বিশেষ করে জেনজি ও হতাশ ডেমোক্র্যাটরা আকৃষ্ট হয়েছেন তার শৈলী ও স্পষ্টবাদিতায়। একজন মুসলিম অভিবাসী হিসেবে নিজের বিশ্বাস ও পরিচয় নিয়ে অকপট মামদানি ছিলেন অনেকের কাছে নিজস্ব অভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি। মামদানি বলেন, নিউইয়র্কবাসীদের সঙ্গে তার কথাবার্তা মূলত মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রয়োজনে সিটি সরকারের ভূমিকা নিয়ে। তবু তিনি নিম্নআয়ের মানুষের কাছে কম সমর্থন পেয়েছেন, যেখানে কুয়োমো এগিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দলের ভেতরেই এমন নেতাদের দেখা গেছে যারা ট্রাম্পের মতো কর্তৃত্ববাদী ব্যক্তিকে ঠেকাতে অপারগ। তাই দরকার এমন মেয়র যিনি কর্তৃত্ববাদকে চোখে চোখ রেখে দেখতে পারবেন—নিজেকে নয়।‘
প্রগ্রেসিভ চেঞ্জ ক্যাম্পেইন কমিটির স্টেফানি টেইলরের মতে, এটা ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি ‘ওয়েক-আপ কল’ হওয়া উচিত। প্রতিষ্ঠানপন্থী ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের আদর্শিক কারণে অনেক সম্ভাবনাময় প্রার্থীকে রুখে দিয়েছে।
এখন মামদানির সামনে সাধারণ নির্বাচনে জয়ের চ্যালেঞ্জ। তিনি জিতলে, তার বড় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কীভাবে কাজ করেন—সেটাই হবে বড় প্রশ্ন। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা কম থাকলেও, তার কাছে ভোটারদের প্রত্যাশা এখন অনেক বেশি।
বিবিসি অবলম্বনে