দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ নেয়ার আশঙ্কা

চীন-জাপান সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়ছে

তাইওয়ান ইস্যুতে জাপানি প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক এক মন্তব্যকে ঘিরে টোকিও এবং বেইজিংয়ের সম্পর্কে সৃষ্ট উত্তেজনা দিনে দিনে আরো প্রকট হয়ে উঠছে। এর জের ধরে এরই মধ্যে জাপানে সামুদ্রিক খাবার রফতানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে চীন। এছাড়া জাপানের দখলে থাকা বিরোধপূর্ণ সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জের জলসীমায় কোস্টগার্ডও পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে নিজ দেশের নাগরিকদের জাপান ভ্রমণে সতর্কতাও জারি করেছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের ক্রমঅবনতির বিষয়টি এখন যে পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েছে, তাতে তা সামনের দিনগুলোয় দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ নিতে পারে।

চলতি সপ্তাহেই দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা প্রশমন। যদিও তা শেষ হয়েছে কোনো ধরনের অগ্রগতি ছাড়াই। পরদিনই বেইজিং জাপানি সামুদ্রিক খাদ্য আমদানির ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা চলতি বছরের শুরুতে সম্পর্ক উন্নয়নে সদিচ্ছার বহিপ্রকাশ হিসেবে আংশিকভাবে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত এক দশকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের এতটা অবনতি দেখা যায়নি। এর আগে দুই দেশের মধ্যে বিরোধের মূল বিষয়বস্তু ছিল সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিরোধ। ২০১০ সালে সেনকাকুর কাছে এক চীনা জেলের নৌকা আটকে দেয় জাপান। জবাবে দেশটি বিরল খনিজের রফতানি বন্ধ করে দেয় চীন। এর পর ২০১২ সালে জাপান সেনকাকু দ্বীপকে জাতীয়করণের ঘোষণা দেয়। সে সময় চীনে জাপানবিরোধী বয়কট ও ভাঙচুর শুরু হয়। ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দুই দেশের নেতাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক স্থবির হয়ে থাকে। সে সময় শি জিনপিং ও শিনজো আবের সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে বিষয়টির সমাধান ঘটে।

বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে চীন এরই মধ্যে জাপানের দখলে থাকা সেনকাকু (চীনের ভাষায় দিয়াওইউ) দ্বীপপুঞ্জের জলসীমায় কোস্টগার্ড জাহাজ পাঠিয়েছে। একইসঙ্গে জাপানের বাইরের অংশ ঘেঁষে ড্রোন উড়িয়েছে চীনের সামরিক বাহিনী।

এ বিষয়ে টোকিওভিত্তিক দাইওয়া সিকিউরিটিজের চীন–বিষয়ক অর্থনীতিবিদ নাওতো সাইতো নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ক এখন ২০১২ সালের পর সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে। সেনকাকু ও তাইওয়ান—উভয়ই চীনের কাছে সার্বভৌমত্বের ইস্যু, যেখানে বেইজিং পিছিয়ে আসবে না। ফলে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী ও আরো তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সেক্ষেত্রে চীন হয়তো আবার জাপানে বিরল খনিজ রফতানি বন্ধ করবে কিংবা দেশটির মধ্যে জাপানি পণ্য বয়কটের ডাকও আসতে পারে।’

দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার সূচনা জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির এক সাম্প্রতিক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে। সম্প্রতি দেশটির পার্লামেন্টে দেয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, চীন তাইওয়ানে হামলা করলে তা জাপানের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দেবে। সেক্ষেত্রে সামরিক প্রতিক্রিয়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

চীন এ মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানালে টোকিও তা প্রত্যাখ্যান করে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে এক চীনা কূটনৈতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘জাপানি প্রধানমন্ত্রীর মুণ্ডচ্ছেদ করা উচিত’ বলে বক্তব্য রাখেন, যা জাপানের ভেতরে ক্ষোভ বাড়ায়। এরই মধ্যে তাকে জাপানে অবাঞ্ছিত ও অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি (পারসোনা নন গ্রাটা) বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

তবে গতকালই জাপানের শাসক দল এলডিপির নেতারা উত্তেজনা কমাতে চীনের প্রতি সংলাপে বসা এবং কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।

সানায়ে তাকাইচির মন্তব্যের জের ধরে এরই মধ্যে চীন বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এগুলো হলো নাগরিকদের উদ্দেশে জাপানে ভ্রমণ নিয়ে সতর্কতা জারি, চীনা শিক্ষার্থীদের জাপানে পড়াশোনায় নিরুৎসাহিত করা, চীনে জাপানি সিনেমা মুক্তি স্থগিত করে দেয়া এবং জাপানি বিনোদন কোম্পানি ইয়োশিমোতো কোগিয়োর কমেডি ট্যুর বাতিল। এছাড়া বেইজিং জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের সংস্কৃতি মন্ত্রীদের নিয়ে আয়োজিত বৈঠকও স্থগিত করেছে। আগামী ২৪ নভেম্বর এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

এছাড়া চীনের মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটি দেশটিতে গুপ্তচরবিরোধী অভিযান আরো জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে। বিষয়টি জাপানি ব্যবসায়ীদের ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

চীনের এ অবস্থান প্রসঙ্গে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, ‘জাপান অস্তিত্বের হুমকি ও আত্মরক্ষার অজুহাত দিয়ে আক্রমণের পথ তৈরি করছে, যা দেশটিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে দেখা দেয়া সামরিকবাদের পুনরুত্থান ঘটাতে পারে।

দুই দেশের এ বিরোধ দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জাপানি বিশ্লেষকরা। এনএলআই রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক ইউসুকে মিউরা নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, ‘জাপানকে দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’

নিক্কেই এশিয়া অবলম্বনে

আরও