সামুদ্রিক খাতের কর্মকর্তারা গতকাল জানিয়েছেন, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালির কাছে পৃথক দুটি ঘটনায় ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য অস্ত্রের আঘাতে একটি কনটেইনার জাহাজ ও একটি বাল্ক ক্যারিয়ার ডুবে গেছে। খবর রয়টার্স।
গত ১০ দিনে এ নৌপথের আশপাশে হামলার ঘটনা বেড়েছে। ইরান জানিয়েছে, তাদের বন্দরে মার্কিন অবরোধ এবং গত মাসে আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞার জবাবে হামলা জোরদার করছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা খাতের সূত্রগুলোর তথ্যানুযায়ী, সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী জিএফএস প্রাইড নামের একটি ছোট কনটেইনার জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় ডুবে যায়। জাহাজটির ধারণক্ষমতা ছিল ২ হাজার ৮২৪ টিইইউ।
গতকাল এক বিবৃতিতে সিঙ্গাপুরের মেরিটাইম অ্যান্ড পোর্ট অথরিটি (এমপিএ) জানায়, ‘জিএফএস প্রাইড হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। পরে এটি ডুবে যায়। জাহাজের ২১ জন নাবিককে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। কেউ আহত হননি।’
কর্তৃপক্ষ জানায়, গত মঙ্গলবার জাহাজটি প্রণালি দিয়ে চলাচল করছিল।
অন্য একটি ঘটনায় অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডার পতাকাবাহী কেপ দাও হরমুজ প্রণালির কাছে ডুবে গেছে। জাতিসংঘের নৌপরিবহনবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) তথ্যানুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর জাহাজটি ডুবল।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওই হামলায় একজন নাবিক নিহত হন। হামলার পরপরই জাহাজের বাকি নাবিকদের সরিয়ে নেয়া হয়।
আইএমওর জাহাজ দুর্ঘটনাসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জিএফএস প্রাইড ও কেপ দাও যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় জাহাজ, যেগুলো ডুবে গেছে।
সিঙ্গাপুরের কর্তৃপক্ষ বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে অব্যাহত হামলার ঘটনায় এমপিএ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘এ ধরনের হামলা বিনা উসকানিতে চালানো হচ্ছে। এগুলোর কোনো যৌক্তিকতা নেই এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।’
সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান মারিস্কস গতকাল বলেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আবারো নিশ্চিত করছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকি এখনো রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি আরো বলেছে, এই হুমকি শুধু জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কনটেইনার জাহাজ ও বাল্ক ক্যারিয়ারও গুরুতর ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
ইরানের নিয়ন্ত্রণ আরো কঠোর
হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকি দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় নৌপথটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে নৌপথটির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো কঠোর করার চেষ্টা করছে তেহরান। ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের কৌশল হিসেবে প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে দেশটি।
ইরানের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের দাম উচ্চ স্তরে ধরে রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের বিরুদ্ধে ক্রমেই নতুন কৌশলে হামলা চালাচ্ছে ইরান।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু তেলবাহী ট্যাংকার হলেও পণ্যবাহী ও কনটেইনার জাহাজও হামলার শিকার হচ্ছে। এসব জাহাজের কোনো কোনোটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে, আবার কোনোটি ডুবেও গেছে।
গত মার্চে মাল্টার পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ সেফিন প্রেস্টিজে ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো অস্ত্রের আঘাত লাগে। পরে হরমুজ প্রণালির উত্তরে জাহাজটি ডুবে যায়।
এপ্রিলে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) কনটেইনার জাহাজ এমএসসি ফ্রানচেস্কায় হামলা চালিয়ে সেটি জব্দ করে।