ইন্দোনেশিয়ার খনিজ সম্পদে বিশেষ প্রবেশাধিকার চায় চীন

ইন্দোনেশিয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিকেল মজুদ রয়েছে। রফতানি নিষেধাজ্ঞার আগে চীনের মোট নিকেল আকরিক আমদানির প্রায় অর্ধেকই সরবরাহ করত ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার উৎপাদন খাতের উন্নয়ন এবং দেশটির পণ্যে মূল্য সংযোজন বাড়াতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে চীন। বিশ্লেষকদের মতে, এ প্রস্তাবের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ার অপরিশোধিত খনিজ সম্পদের সরবরাহ ব্যবস্থায় চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য বিশেষ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে চাইছে বেইজিং।

স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং দেশীয় খনিজ প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইন্দোনেশিয়া ২০১৪ সাল থেকে ধাপে ধাপে অপরিশোধিত নিকেল, বক্সাইট ও তামা রফতানি নিষিদ্ধ করে। দেশটির নীতির কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের খনিজ উত্তোলনের পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ার ভেতরেই পরিশোধনাগার ও প্রক্রিয়াকরণ কারখানা স্থাপন করতে হচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিকেল মজুদ রয়েছে। রফতানি নিষেধাজ্ঞার আগে চীনের মোট নিকেল আকরিক আমদানির প্রায় অর্ধেকই সরবরাহ করত ইন্দোনেশিয়া। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর দেশটির বাজার থেকে সরে যেতে হয় চীনা কোম্পানিগুলোকে। এতে তারা ব্যাপক পরিমাণ লোকসানের মুখোমুখি হয়। স্টেইনলেস স্টিল, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি এবং অন্যান্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তিতে নিকেল গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।

ইন্দোনেশিয়ায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ওয়াং লুতং বলেছেন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও শিল্প খাতের সমন্বয়সহ দুই দেশের মধ্যে আরো ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক চীন ও ইন্দোনেশিয়ার উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে। তার মতে, ইন্দোনেশিয়ার খনিজ সম্পদভিত্তিক ‘ডাউনস্ট্রিমিং কর্মসূচি’র সঙ্গে চীনের উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করা গেলে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়ানো সম্ভব হবে। ডাউনস্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে অপরিশোধিত খনিজ সরাসরি রফতানি না করে দেশের ভেতরে তা প্রক্রিয়াজাত করে অধিক মূল্যবান পণ্যে রূপান্তর করতে চাইছে জাকার্তা।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইউসুফ ইশাক ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো জয়ন্ত মেনন বলেন, ইন্দোনেশিয়ায় খনিজ প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে মূল্য সংযোজনকারী চীনা বিনিয়োগকারীরা দেশটির বিশাল স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করতে পারবে। পাশাপাশি এসব পণ্যের একটি অংশ আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করে রফতানিও করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, তারা এই সরবরাহ ব্যবস্থার যতটা সম্ভব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।’

গত এক দশকে ইন্দোনেশিয়ার খনিজ গলনাগার, শিল্পাঞ্চল এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির উপকরণ প্রক্রিয়াকরণ স্থাপনায় চীনা কোম্পানিগুলো ৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে অপরিশোধিত খনিজ সরাসরি চীনে না নিয়েও ইন্দোনেশিয়ার ভেতরে সেগুলো প্রক্রিয়াকরণের সুযোগ পাচ্ছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। একই সঙ্গে প্রযুক্তি ও অবকাঠামো পাওয়ায় ইন্দোনেশিয়ার স্থানীয় প্রক্রিয়াকরণ শিল্পও সম্প্রসারিত হয়েছে।

জয়ন্ত মেনন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে চীনকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, তখন ইন্দোনেশিয়া বেইজিংয়ের কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তার মতে, জাকার্তাও বাড়তি চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে পারে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দোনেশিয়া এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রফতানির ওপর বিদ্যমান বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করবে জাকার্তা। এ পরিস্থিতিতে ইন্দোনেশিয়ার খনিজ খাতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা আরো বাড়তে পারে।

চীনা রাষ্ট্রদূত বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি উপকরণ এবং ইস্পাত প্রক্রিয়াকরণ খাতে দুই দেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগের কথাও উল্লেখ করেছেন। এ তিনটি শিল্পই বিপুল পরিমাণ খনিজ কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। ফলে চীনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ইন্দোনেশিয়ার খনিজভিত্তিক শিল্পে চীনা কোম্পানিগুলোর অবস্থান আরো শক্তিশালী হতে পারে।

আরও