আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার জবাবে বেইজিংয়ের ‘অ্যান্টি-স্যাংশন’ আইন যেভাবে কাজ করে

আইনটি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে একটি ‘বাইনারি চয়েস’ বা দ্বিমুখী সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কোম্পানিগুলো যদি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মানে, তবে তারা চীনের রোষানলে পড়বে। আবার যদি বেইজিংয়ের আদেশ মেনে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে, তবে ওয়াশিংটন তাদের ওপর খড়গহস্ত হবে

ইরানের তেল আমদানির অভিযোগে চীনের পাঁচটি তেল শোধনাগারের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রতিক্রিয়ায় এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে বেইজিং। প্রথমবারের মতো ২০২১ সালে প্রণীত ‘অ্যান্টি-স্যাংশন’ আইন ব্যবহার করে বেইজিং তার নাগরিক ও কোম্পানিগুলোকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার নির্দেশ দিয়েছে। ওয়াশিংটনের ‘লং-আর্ম জুরিসডিকশন’ বা একতরফা বৈশ্বিক আইনি খবরদারি রুখতেই বেইজিংয়ের এ পদক্ষেপ।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত শনিবার এক প্রজ্ঞাপনে জানিয়েছে, ‘হেনলি পেট্রোকেমিক্যাল’সহ পাঁচটি শোধনাগারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো চীনে ‘স্বীকৃত, কার্যকর বা পালন করা হবে না’। বেইজিংয়ের মতে, নিষেধাজ্ঞাগুলো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে। চীনের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং জাতীয় উন্নয়ন স্বার্থ রক্ষার্থেই এ ‘প্রহিবিশন অর্ডার’ বা নিষেধাজ্ঞা-বিরোধী আদেশ জারি করা হয়েছে।

চীন বর্তমানে ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। গত ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশেরই গন্তব্য ছিল চীন।

কীভাবে কাজ করে এ আইন?

২০২১ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যখন চীনা প্রযুক্তি ও কোম্পানিগুলোর ওপর একের পর এক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসছিল, তখন তার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে আইনটি তৈরি করে বেইজিং। এর কার্যপ্রণালী নিম্নরূপ:

  • রিপোর্টিং বাধ্যবাধকতা: যদি কোনো চীনা নাগরিক বা সংস্থা বিদেশী আইনের কারণে ব্যবসায়িক বাধার মুখে পড়ে, তবে ৩০ দিনের মধ্যে তা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে। ব্যর্থতায় জরিমানা বা শাস্তির বিধান রয়েছে।
  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা: অভিযোগ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয় যদি মনে করে যে বিদেশী নিষেধাজ্ঞাটি ‘অন্যায্য’, তবে তারা একটি আদেশ জারি করবে যা সেই বিদেশি আইন মানতে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নিষেধ করবে।
  • ক্ষতিপূরণ ও আইনি সুরক্ষা: যদি কোনো পক্ষ বিদেশী নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার কারণে অন্য কোনো চীনা কোম্পানির ক্ষতি করে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানি চীনের আদালতে মামলা করে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে। সরকার এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।

নেদারল্যান্ডসের মাস্ট্রিখট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক নাইমেহ মাসুমি আল জাজিরাকে জানান, আইনটি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চীনের দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে একটি বিধিবদ্ধ আইনি কাঠামোয় রূপ দিয়েছে। তার মতে, এর আগে চীন কূটনৈতিক প্রতিবাদ এবং অনানুষ্ঠানিক চাপের ওপর নির্ভর করত। কিন্তু এ প্রতিরোধকে বিধিবদ্ধ আইনে রূপ দিয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে একটি পদ্ধতিগত ও দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে চীন, যার জন্য কেবল সাময়িক প্রতিক্রিয়া নয় বরং একটি কাঠামোগত আইনি সমাধান প্রয়োজন।

প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এর প্রভাব কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনটি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে একটি ‘বাইনারি চয়েস’ বা দ্বিমুখী সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কোম্পানিগুলো যদি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মানে, তবে তারা চীনের রোষানলে পড়বে। আবার যদি বেইজিংয়ের আদেশ মেনে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে, তবে ওয়াশিংটন তাদের ওপর খড়গহস্ত হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে যেসব প্রতিষ্ঠানের বড় বিনিয়োগ রয়েছে বা যারা ডলারে লেনদেন করে, তাদের জন্য বেইজিংয়ের আদেশ অমান্য করা কঠিন। তবে চীনের সরকারি প্রতিষ্ঠান বা চীন-নির্ভর কোম্পানিগুলোর জন্য বেইজিংয়ের আইন মেনে চলাই এখন বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো বেইজিংয়ের এ পদক্ষেপকে ‘একতরফা আধিপত্যের’র বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে। ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো শক্তিগুলো ভবিষ্যতে চীনের এ ‘কোডিফাইড কাউন্টার-স্যাংশন’ মডেলটি অনুসরণ করতে পারে। তবে ইরান বা রাশিয়ার মতো দেশগুলোর জন্য এটি খুব বেশি কার্যকর নাও হতে পারে, কারণ তারা ইতোমধ্যেই মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন।

আরও