জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশ নিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের শীর্ষ নেতাদের ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসনের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ শুধু ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে অবৈধ প্রমাণ করার জন্য ইসরায়েলের প্রচারণার সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্ণ সমর্থনকেই প্রতিফলিত করে না, বরং এটি জাতিসংঘের প্রতি চরম অসম্মানেরও প্রকাশ।
১৯৪৭ সালের জাতিসংঘ সদরদপ্তর চুক্তি অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে আমন্ত্রিত প্রতিনিধি বা কর্মকর্তাদের প্রবেশ আটকে দিতে পারে না। অথচ এবার ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগও তোলা হয়নি।
অতীতে যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল, তাদের জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলের সদস্যদের জন্য ভিসা পাওয়া কঠিন করে তুলত। ২০১৩ সালে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের কয়েক মাস পর রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশ নেয়ার ভিসা পাননি। তবে, পরে ল্যাভরভকে ভিসা দেয়া হয়েছিল।
জাতিসংঘের একজন কূটনীতিক ইসরায়েলের গণমাধ্যম হারেৎজকে জানিয়েছেন, ভেনিজুয়েলা এবং রাশিয়ার ক্ষেত্রে এই ধরনের পদক্ষেপ এত প্রকাশ্যে নেয়া হয়নি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের বিবৃতিতে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও) বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট নিরাপত্তার অভিযোগ উল্লেখ করেনি। মূলত, ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিরা জাতিসংঘের প্রক্রিয়া ব্যবহার করে স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের সাহস করার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের জাতিসংঘে যোগ দিতে বাধা দিচ্ছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টেফান দুজারিক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ঘোষণার জবাবে বলেছেন, জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সদর দপ্তর চুক্তি অনুযায়ী এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই সমস্যাটির সমাধান হবে কারণ, সকল সদস্য রাষ্ট্র ও স্থায়ী পর্যবেক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত এবার জাতিসংঘে ফ্রান্স এবং সৌদি আরব কর্তৃক আয়োজিত দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান নিয়ে একটি অধিবেশন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের প্রাক্তন ডিন প্রফেসর ইউভাল শানির মতে, আন্তর্জাতিক আদালতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ আছে জাতিসংঘের। এতে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের প্রবেশের অনুমতি দিতে বাধ্য করা যাবে। তবে তিনি নিজেই সেই সম্ভাবনা অনেকটা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, বর্তমান সময় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জটিল সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে এটি হয়তো সম্ভব নয়।
সদস্য রাষ্ট্রগুলোর হাতেও আরেকটি বিকল্প আছে— সাধারণ পরিষদের বৈঠক, বা অন্তত দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান বিষয়ক অধিবেশনটি জেনেভার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে স্থানান্তরিত করা। অতীতেও এমন নজির আছে। সেটাও ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিকে প্রবেশে যুক্তরাষ্ট্রের অস্বীকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৯৮৮ সালে, তৎকালীন ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে আসার সময় যুক্তরাষ্ট্র ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
শানির মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে, ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অন্য কোনো সদস্য জুমের মাধ্যমে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ করবেন এমন সম্ভাবনা বেশি। এর বাইরে আরেকটি বিকল্প আছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর যেখানে জাতিসংঘের প্রভাব অনেকটাই সীমিত, সেখানে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেও এটা সম্ভব। তাছাড়া, সৌদি আরব আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠানে ফিলিস্তিনি নেতাদের অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা ট্রাম্পের তার মিত্র মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রতি খুব একটা বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ হবে না।