বেআইনি আটক বন্ধ ও ইন্টারনেট-মেট্রো চালুর নির্দেশ আদালতের

দেশজুড়ে আন্দোলনের ঘোষণা সিজেপির আজ বিক্ষোভে নামছে ইন্ডিয়া ব্লক

দিল্লিতে শনিবারের ব্যাপক ধরপাকড়, মেট্রো ও রেল চলাচলে বিধিনিষেধ এবং ইন্টারনেট বন্ধের অভিযোগের পর গতকাল ছুটির দিনেও বিশেষ শুনানিতে বসেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে চলমান বিক্ষোভ ঘিরে গণহারে আটক ও দিল্লিতে চলাচল সীমিত করার ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। শান্তিপূর্ণভাবে জড়ো হওয়া মানুষকে বেআইনিভাবে আটক না করতে এবং দিল্লিতে মেট্রো, রেল ও ইন্টারনেট পরিষেবা স্বাভাবিক রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে মানুষের অবাধ চলাচল নিশ্চিত, অপ্রয়োজনীয় ব্যারিকেড সরানো এবং সাংবাদিক ও আইনজীবীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা না দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে আদালতের নির্দেশের পরও দিল্লি পুলিশের ধরপাকড় থামেনি। গতকাল দিল্লির রাজীব চক, কনট প্লেসসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভের চেষ্টা করলে ছাত্র ও আন্দোলনকারীদের আটক করে পুলিশ; মুম্বাই ও গোয়াতেও বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয়।

তবে আন্দোলন থেকে পিছু হটছে না ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত বিক্ষোভ চলবে এবং তা দিল্লির বাইরে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হবে। এদিকে আজ নতুন করে দিল্লিতে বিক্ষোভে নামছে বিরোধী দলগুলোর জোট ইন্ডিয়া ব্লক। কংগ্রেস তার সব এমপিকে দিল্লিতে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।

দিল্লিতে শনিবারের ব্যাপক ধরপাকড়, মেট্রো ও রেল চলাচলে বিধিনিষেধ এবং ইন্টারনেট বন্ধের অভিযোগের পর গতকাল ছুটির দিনেও বিশেষ শুনানিতে বসেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ। আদালত বলেন, ভারতীয় নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার সংরক্ষিত থাকবে এবং আইনসম্মত কারণ ছাড়া কাউকে আটক করা যাবে না। বিশেষ করে শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র সমাবেশে অংশ নেয়া মানুষকে বেআইনিভাবে আটক করা যাবে না। আদালত দিল্লি মেট্রো ও রেল পরিষেবা স্বাভাবিকভাবে চালু রাখার নির্দেশ দেন। জনশৃঙ্খলা রক্ষায় আইন অনুযায়ী প্রয়োজন না হলে এসব পরিষেবায় বাধা দেয়া যাবে না। ইন্টারনেট পরিষেবাও সচল রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে বসানো ব্যারিকেডের প্রয়োজনীয়তা অবিলম্বে পর্যালোচনা করে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতিরা। সুপ্রিম কোর্ট ও অন্যান্য আদালতের আশপাশে ১৬৩ ধারা জারির যেসব বোর্ড ছিল, সেগুলোও সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে, যাতে বিচারপ্রার্থীদের আদালতে যাতায়াতে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়।

আদালতের নির্দেশের পর গতকালও দিল্লির বিভিন্ন স্থানে ধরপাকড় অব্যাহত ছিল। রাজীব চক, কনট প্লেস ও আরকে আশ্রম এলাকায় বিক্ষোভের চেষ্টা করলে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের আটক করা হয়। রাজীব চক এলাকায় পুলিশের বাসে তোলা কয়েকজনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কয়েকজন সাংবাদিককেও অল্প সময়ের জন্য আটক করা হয়েছিল। এর মধ্যেই মুক্তি পাওয়া সিজেপির নেতারা আন্দোলন আরো বিস্তৃত করার ঘোষণা দিয়েছেন। সংগঠনটির সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘লড়াই কেবল শুরু হয়েছে।’ প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না বলেও জানান তিনি। সিজেপি নেতা সৌরভ দাস বলেন, বিক্ষোভ শুধু দিল্লিতে সীমিত থাকবে না; সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হবে।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে শনিবার মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর বিমানের ভেতর থেকেই আটক করা হয়। প্রতিরোধমূলক আটকের পর গতকাল সকালে তাদের দিল্লি ক্যান্টনমেন্টে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়। এক বছরের জন্য শান্তিভঙ্গ না করার শর্তে তাদের মুক্তি দেয়া হয়। তবে সিজেপি বলেছে, কোনো নেতাই ভবিষ্যতে বিক্ষোভ করবেন না—এমন কোনো বন্ডে সই করেননি। শান্তিভঙ্গ না করা এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ না নেয়া এক বিষয় নয়; শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সাংবিধানিক অধিকার বলে দাবি তাদের। মুক্তির পর দীপকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তিনি এমন কোনো বন্ডে সই করেননি যা তাকে আবার বিক্ষোভে নামতে বাধা দেয়। তিনি ফের রাস্তায় নামার ঘোষণা দেন। সিজেপি গতকাল সন্ধ্যায় দিল্লিতে থাকা সমর্থকদের রাজধানীতেই অবস্থান করতে বলেছে।

দিল্লির বাইরেও গতকাল বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে সিজেপির সমর্থনে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের অনেককে আটক করে পুলিশ। তাদের মধ্যে অ্যাক্টিভিস্ট অঞ্জলি দমানিয়াও ছিলেন। আগের দিন মুম্বাইয়ে অনুমতি ছাড়া বিক্ষোভের অভিযোগে প্রায় ৬০০ জনকে আটক করা হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। গোয়ায় আজাদ ময়দানের দিকে যাওয়া কয়েকজন বিক্ষোভকারীকেও আটক করা হয়।

এদিকে আন্দোলনের পরবর্তী ধাপে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে ইন্ডিয়া ব্লক। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী জানিয়েছেন, আজ কংগ্রেস, পুরো ইন্ডিয়া জোট এবং তরুণরা আবার দিল্লির রাস্তায় নামবে। কংগ্রেস সব এমপিকে এদিন দিল্লিতে অবস্থান করতে বলেছে। বিরোধী জোটের নেতারা সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করবেন এবং বিকাল ৪টার পর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করে একটি স্মারকলিপি দেয়ার পরিকল্পনা করেছেন।

রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, শনিবার বিক্ষোভ দমনে পুলিশ বলপ্রয়োগ করেছে এবং বিজেপি-আরএসএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আন্দোলনকারীদের ভয় দেখিয়ে বিক্ষোভ থামানো যাবে না। তবে বিজেপি বিরোধীদের নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের অভিযোগ, সিজেপির আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী চিরাগ পাসওয়ানও বলেছেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার থাকলেও সহিংসতা বা অরাজকতা সৃষ্টির অধিকার কারো নেই।

চলমান আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর নিয়ে অভিযোগ। সিজেপি ও বিরোধী দলগুলোর দাবি, এ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং এর দায় নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

আরও