দীর্ঘ চার মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধে অবশেষে সমঝোতা স্মারকে সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এর মধ্য দিয়ে স্বস্তি ফিরেছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে। ওয়েল প্রাইস ডটকমের তথ্য বলছে, বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড ওয়েল ৭৮ ডলার ৯০ সেন্টে লেনদেন হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে জড়ানো এ দু দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর থেকে বিশ্ববাজারে কমতে শুরু করে জ্বালানি তেলের দাম। তবে এরপরও দফায় দফায় হামলা-পাল্টা হামলা আর হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সংকট রয়েই যায়।
এর মধ্যে বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করেন, প্রয়োজন হলে তিনি আবারও ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করতে পারেন। তার ওই মন্তব্যের পর জ্বালানি তেলের দাম কমার প্রবণতা সাময়িকভাবে থেমে গিয়েছিল, চুক্তি সইয়ের পর তা আবার শুরু হয়েছে।
সমঝোতা চুক্তিতে যুদ্ধের অবসান এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই খবরের প্রভাব বিশ্ববাজারেও পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড ওয়েল সপ্তাহের শুরুতে প্রায় ৮৬.৮০ ডলারে লেনদেন হয়েছিল। এটি বর্তমানে ৭৮.৯০ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের দামের তুলনায় বর্তমান দাম কিছুটা বেশি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত প্রাথমিক এ সমঝোতা চুক্তির পর আগামীকাল শুক্রবারই খুলে যেতে পারে হরমুজ প্রণালি। আর এটি হলে বিশ্ববাজারে মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কারণ প্রণালিটি উন্মুক্ত হলে পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা লাখ লাখ ব্যারেল তেল একযোগে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চলতি মাসেই সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান উপকূলে 'শিপ-টু-শিপ' (জাহাজ থেকে জাহাজে) স্থানান্তরের মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলো তেল রফতানি ব্যাপক বাড়িয়েছিল। সরবরাহের এ আকস্মিক বৃদ্ধির কারণে গত মঙ্গলবারই মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের দাম কমে আসে। আর হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে গেলে বাজারে সরবরাহের এ জোয়ার আরো তীব্র হবে।
জ্বালানি বাজারের তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের বিশ্লেষক মুইউ শু গত ১৭ জুনের এক পূর্বাভাসে জানান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হলে পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে চলে আসতে পারে। এর পাশাপাশি উৎপাদনকারী দেশগুলো বিকল্প বা কম দৃশ্যমান মাধ্যমেও তেলের চালান সরবরাহ অব্যাহত রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কেপলারের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ইরানি তেলের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে চাবাহার বন্দরের পশ্চিমে অবস্থানরত ট্যাংকারগুলো থেকে প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে চলে আসবে। ওয়াশিংটন যদি নিষেধাজ্ঞার আওতা আরো শিথিল করে, তবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ক্রমান্বয়ে আরো বাড়বে।
এদিকে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী অন্য একটি প্রতিষ্ঠান ভোর্টেক্সার উপাত্ত অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে অন্তত ৫৪টি সুপারট্যাংকার উপসাগরীয় অঞ্চলের ভেতরে অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিল।
বিশ্ববাজারে উদ্ভূত এ পরিস্থিতিতে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে রফতানি বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। এরই মধ্যে চলতি সপ্তাহে ইরানের তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার শিকার হওয়ার আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।