বিশ্বাসযোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা

অনন্ত আম্বানিকে অধ্যাপক করায় নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমালোচনা

মূলত জ্বালানি তেল ও গ্যাস ব্যবসা থেকে বিপুল সম্পদ গড়েছেন মুকেশ আম্বানি। তার মালিকানায় রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার। ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দলটিকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অনুদানও দিয়েছে আম্বানির প্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালে অনন্ত আম্বানির বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

মুকেশ আম্বানির জ্বালানি তেল ও গ্যাস ব্যবসার উত্তরাধিকারী এবং বিতর্কিত একটি চিড়িয়াখানার পরিচালনাকারী অনন্ত আম্বানিকে টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়। বিষয়টি পরিবেশবাদী ও সংরক্ষণবাদী কর্মীদের ব্যাপক সমালেচনায় পড়েছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

অনন্ত আম্বানিকে ‘প্রফেসরশিপ অব প্র্যাকটিস’ ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা, প্রাণী কল্যাণ ও পরিবেশগত দায়িত্ব পালনে তার কাজ এবং ‘আরো টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের’ স্বীকৃতি হিসেবে পদটি দেয়া হয়েছে।

মূলত জ্বালানি তেল ও গ্যাস ব্যবসা থেকে বিপুল সম্পদ গড়েছেন মুকেশ আম্বানি। তার মালিকানায় রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার। ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দলটিকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অনুদানও দিয়েছে আম্বানির প্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালে অনন্ত আম্বানির বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

অনন্ত আম্বানির বয়স ৩১ বছর। তিনি রিলায়েন্স গ্রুপের নির্বাহী বোর্ডে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত দেখাশোনা করেন। তার আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ৯ হাজার কোটি পাউন্ড। গুজরাটে জ্বালানি তেল পরিশোধনাগারের কাছে ১ হাজার ৪০০ হেক্টর বা ৩ হাজার ৫০০ একর জমির ওপর ভান্তারা নামে একটি বেসরকারি চিড়িয়াখানা গড়ে তুলেছেন অনন্ত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে দেড় লাখের বেশি প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০০টি সিংহ, ২৫০টি চিতাবাঘ ও ৯০০টি কুমির।

সংরক্ষণবাদী বিভিন্ন সংগঠন এর আগে ভান্তারায় কিছু প্রাণী কীভাবে আনা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। কারণ এসব প্রাণীর অনেকগুলোই বিপন্ন প্রজাতির। তবে ভান্তারাকে কোনো অনিয়মের জন্য কখনো দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি।

এখন নিউক্যাসলের ঘোষণায় একাডেমিক কর্মী এবং ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংরক্ষণবাদী ও পরিবেশবিদদের মধ্যে বিস্ময় ও উপহাসের সৃষ্টি হয়েছে।

ভারতের গণবুদ্ধিজীবী এবং ‘স্পিকিং উইথ নেচার: দ্য অরিজিনস অব ইন্ডিয়ান এনভায়রনমেন্টালিজম’ বইয়ের লেখক রামচন্দ্র গুহ বলেন, ‘বলতেই হবে, এটি বেশ রহস্যজনক একটি পছন্দ। ভারত ও বিশ্বের পরিবেশবাদ নিয়ে একজন গবেষক হিসেবে আমি অন্তত ৫০ জন, সম্ভবত ১০০ জনের নাম বলতে পারি, যারা এই সম্মান পাওয়ার জন্য অনেক বেশি যোগ্য। তাদের মধ্যে রয়েছেন মৃত্তিকাবিজ্ঞানী, জ্বালানি বিজ্ঞানী, পানি সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ, কমিউনিটি ফরেস্টকর্মী, পরিবেশবিদ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞসহ অনেকে। ভারতের ও ভারতীয়দের আরো টেকসই ভবিষ্যতের জন্য তারা বাস্তব ও দৃশ্যমান অবদান রেখেছেন।’

তিনি বলেন, ‘নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয় কার পরামর্শে সিদ্ধান্তটি নিয়েছে এবং এসব ক্ষেত্রে কী করা হয়েছে বা হয়নি, সে বিষয়ে তারা যথাযথ যাচাই করেছে কিনা, তা জানতে আমি আগ্রহী। আম্বানিকে নিয়োগের বিষয়টি অত্যন্ত বিস্ময়কর এবং এতে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভান্তারা নিয়ে একটি গবেষণাপত্র লিখছেন অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য নিয়ে অনুসন্ধানকারী ভারতীয় গবেষক ভুবন ম্যাঙ্গালোর। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এটা কি কোনো রসিকতা?’

নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ ইউনিয়নের শাখার সভাপতি অধ্যাপক ম্যাট পেরি বলেন, পরিবেশগত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীরা এই নিয়োগের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।

সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের জলবায়ু, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক লাইলা মেহতাও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন জায়গা হওয়ার কথা— যেখানে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা হবে এবং করপোরেশনগুলোকে জবাবদিহির আওতায় রাখা হবে। তাদের একাডেমিক বৈধতা দেয়ার জায়গা বিশ্ববিদ্যালয় নয়।’

গত এপ্রিলে অনন্ত আম্বানি ভান্তারা বিশ্ববিদ্যালয় চালু করেন। তারা বলছেন, এটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ভেটেরিনারি বিজ্ঞানের জন্য বিশ্বের প্রথম গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি।

অয়েল চেঞ্জ ইন্টারন্যাশনালের গবেষণা সহপরিচালক লর্ন স্টকম্যান বলেন, ‘জলবায়ু সংকটের এ সময়ে যখন জ্বালানি তেল ও গ্যাস ব্যবহার দ্রুত বন্ধ করার দাবি উঠছে, তখন সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আমাদের আরো ভালো কাজ দাবি করতে হবে।’

নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ‘প্রফেসরশিপ অব প্র্যাকটিস দেয়া হয়েছে ভান্তারার মাধ্যমে সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা, প্রাণী কল্যাণ ও পরিবেশগত দায়িত্ব পালনে আম্বানির অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে। পাশাপাশি রিলায়েন্স গ্রুপের সবুজ জ্বালানির ভবিষ্যতের দিকে রূপান্তরের নির্বাহী নেতৃত্ব দেয়ার কাজেরও স্বীকৃতি এটি।’

আরও