স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন

গাজা যুদ্ধের মধ্যস্থতায় ট্রাম্পের জামাতা কুশনার, ইসরায়েলি সমরাস্ত্র প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকারীও তিনি

কুশনারের ব্যবসায়িক স্বার্থ ও কূটনৈতিক ভূমিকা একই সময়ে চলায় স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকরা। ওয়াশিংটনভিত্তিক সিটিজেনস ফর রেসপনসিবিলিটি অ্যান্ড এথিকসের প্রধান নৈতিকতা কর্মকর্তা সিনথিয়া ব্রাউন বলেন, যারা যুদ্ধ বা সরকারি নীতি থেকে লাভবান হন, তাদের পার্থক্য হলো—নীতি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত যারা নেন, লাভবান ব্যক্তিদের তাদের মধ্যে থাকা উচিত নয়। আর এখানে সেটিই ঘটছে

গাজা যুদ্ধ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। একই সময়ে তার মালিকানাধীন বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান অ্যাফিনিটি পার্টনার্স ইসরায়েলি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফিনিক্স ফাইন্যান্সিয়ালের সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার। আর ফিনিক্স ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র নির্মাতা এলবিট সিস্টেমসসহ অন্তত আটটি সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে। এ কারণে কুশনারের ব্যবসায়িক স্বার্থ ও কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠেছে।

বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি অনুসন্ধান করেছেন সিএনএন। সেখানে দেখা গেছে, ফিনিক্স ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ব্যবসা করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ অন্তত ২৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার, এলবিট সিস্টেমসে। প্রতিষ্ঠানটি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে গত এক বছরে শত শত কোটি ডলারের চুক্তি পেয়েছে। এর মধ্যে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্রের জন্য প্রায় ২০ কোটি ডলার, ১৫৫ মিলিমিটার কামানের গোলার জন্য ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং সামরিক ট্যাংক আধুনিকায়নের জন্য ২১ কোটি ডলারের চুক্তি রয়েছে।

এলবিটের মোট আয়ের ৩২ শতাংশের উৎস ইসরায়েল, যা ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় বাজার ছিল। ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধ শুরুর পর এলবিটের শেয়ারের দাম ১৬৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তাদের পণ্যের চাহিদা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে’।

ফিনিক্সের আরেকটি বড় বিনিয়োগের আকার ৬ কোটি ৮০ লাখ ডলারের বেশি, নেক্সট ভিশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানে। তারা সামরিক ড্রোনের জন্য ক্যামেরা তৈরি করে এবং এলবিট ও ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে এসব পণ্য বিক্রি করে। এছাড়া ফিনিক্স অন্তত ৪ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে রেশেফ টেকনোলজিসে, যারা কামানের গোলার জন্য ইলেকট্রনিক ফিউজ তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে তারা ১৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের অর্ডার পেয়েছে।

ফিনিক্সের আরো বিনিয়োগ রয়েছে ইসরায়েল শিপইয়ার্ডস, আশোট আশকেলন, বোয়িং ও ক্যাটারপিলারে। ইসরায়েল শিপইয়ার্ডস ইসরায়েলি নৌবাহিনীর জন্য দ্রুতগতির হামলাকারী নৌযান তৈরি করে। ফিনিক্সের ওই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ২৪ হাজার ৫২৪ ডলার। আশোট আশকেলন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে এবং এতে ফিনিক্সের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার রয়েছে।

এছাড়া ফিনিক্সের বোয়িংয়ে ৪০ লাখ ডলার এবং ক্যাটারপিলারে ২৫ লাখ ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। বোয়িংয়ের পণ্যগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও ছোট ডায়ামিটার বোমা রয়েছে। আর ক্যাটারপিলারের তৈরি বুলডোজার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গাজা ও লেবাননে ব্যবহার করেছে বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে।

কুশনারের অ্যাফিনিটি ফিনিক্সের শেয়ারে বিনিয়োগ শুরু করে ২০২৪ সালে। ওই বছরের জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটি ১২ কোটি ৮৫ লাখ ডলারে ফিনিক্সের ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ শেয়ার কিনেছিল। পরে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার মাত্র পাঁচ দিন আগে অ্যাফিনিটি ফিনিক্সে তাদের অংশীদারত্ব প্রায় দ্বিগুণ করে এবং প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডারে পরিণত হয়।

কুশনার তখন বলেছিলেন, ইসরায়েলের অর্থনৈতিক শক্তির ওপর আস্থা থেকেই এ বিনিয়োগ করা হয়েছে। ব্লুমবার্গকে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাইয়ে ফিনিক্সে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তটি ইসরায়েলের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা এবং ফিনিক্সের ব্যবসার মৌলিক ভিত্তির ওপর আমার বিশ্বাস থেকে নেয়া।’

এর পরই গাজা যুদ্ধ নিয়ে কুশনার আরো সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ২০২৫ সালের মে থেকে তিনি ট্রাম্পের অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ শুরু করেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে আলোচনায় তিনি যুক্ত হন। গত বছরের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি তৈরিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজা। ছবি: রয়টার্স

কুশনার নিজেই বলেছেন, গাজা নিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠার পর ট্রাম্প ও তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ তাকে আরো সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে বলেন। তার ভাষায়, ‘গাজা নিয়ে বিষয়টি শুরু হয়েছিল। … আমি স্টিভকে অনেক সাহায্য করেছি, নীরবে। এরপর গাজা নিয়ে পরিস্থিতি যখন খুব উত্তপ্ত হয়ে উঠল, তখন স্টিভ ও প্রেসিডেন্ট আমাকে আরো সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে বলেন।’

একই সময়ে কুশনার গাজার ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন নিয়েও ব্যবসায়িক সম্ভাবনার কথা বলেছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে তিনি গাজার পুনর্গঠনের একটি পরিকল্পনা তুলে ধরেন। সেখানে উপকূলীয় পর্যটন এলাকা, ১৮০টি আকাশচুম্বী ভবনের সমান দীর্ঘ একটি অঞ্চল এবং একটি বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনার কথা বলা হয়। তিনি বলেন, ‘নিউ গাজা’ শিল্পের কেন্দ্র হয়ে উঠবে এবং বেসরকারি খাতের জন্য সেখানে ‘অসাধারণ বিনিয়োগের সুযোগ’ থাকবে।

কুশনারের আইনজীবী অবশ্য বলেছেন, ফিনিক্স কোন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করবে, সে সিদ্ধান্তে কুশনারের কোনো সরাসরি ভূমিকা নেই। তার ভাষায়, কুশনার ‘ফিনিক্সের সিদ্ধান্তে কখনো অংশ নেননি বা নির্দেশ দেননি’। তিনি আরো বলেন, কুশনার ওই নয়টি প্রতিষ্ঠানে শেয়ার কেনা, ধরে রাখা বা বিক্রির সিদ্ধান্তেও যুক্ত ছিলেন না।

তবে কুশনার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফোর্বসকে জানিয়েছিলেন, ফিনিক্সের নেতৃত্বের সঙ্গে তার ‘খুব সক্রিয় যোগাযোগ’ রয়েছে এবং তিনি কয়েক সপ্তাহ পরপর তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তার আইনজীবীও পরে জানান, কুশনার নিয়মিত ফিনিক্সের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কোম্পানি, বাজার পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য কৌশলগত সুযোগ নিয়ে কথা বলতেন। তবে কূটনৈতিক কাজে বেশি যুক্ত হওয়ার পর এসব যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে তিনি জানান।

কুশনারের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান অবশ্য তার বিনিয়োগ থেকে বড় ধরনের মুনাফা করেছে। জুলাইয়ে অ্যাফিনিটি ফিনিক্সে তাদের শেয়ার এক-চতুর্থাংশের কিছু বেশি ৩৪ কোটি ডলারের বেশি দামে বিক্রি করে। এতে প্রাথমিক বিনিয়োগের তুলনায় পাঁচ গুণের বেশি রিটার্ন আসে। এরপরও কুশনারের অ্যাফিনিটির হাতে ফিনিক্সের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ শেয়ার ছিল, যার মূল্য জুলাইয়ে ১০০ কোটি ডলারের বেশি।

সিএনএন জানিয়েছে, কুশনারের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড এসব বিনিয়োগকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে—এমন কোনো প্রমাণ তারা পায়নি। তবে তার ব্যবসায়িক স্বার্থ ও কূটনৈতিক ভূমিকা একই সময়ে চলায় স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকরা। ওয়াশিংটনভিত্তিক সিটিজেনস ফর রেসপনসিবিলিটি অ্যান্ড এথিকসের প্রধান নৈতিকতা কর্মকর্তা সিনথিয়া ব্রাউন বলেন, ‘যারা যুদ্ধ বা সরকারি নীতি থেকে লাভবান হন, তাদের পার্থক্য হলো—নীতি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত যারা নেন, লাভবান ব্যক্তিদের তাদের মধ্যে থাকা উচিত নয়। আর এখানে সেটিই ঘটছে।’

হোয়াইট হাউজ অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। হোয়াইট হাউজের উপপ্রধান প্রেস সেক্রেটারি আনা কেলি বলেন, ‘জ্যারেড কুশনারের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার কূটনৈতিক দায়িত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রেসিডেন্টের অনুরোধে তিনি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এসব কূটনৈতিক কাজ করেন।’

অন্যদিকে কুশনার নিজেও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগকে ভিন্নভাবে দেখেছেন। ২০২৫ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘মানুষ যেটাকে স্বার্থের সংঘাত বলে, স্টিভ ও আমি সেটাকে অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক বলি।’

আরও