এআই ও শিল্পায়নের বাড়তি চাহিদা

পানি নিরাপত্তায় বিলিয়ন ডলার ঢালছে উপসাগরীয় দেশগুলো

তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ার চেষ্টা করছে উপসাগরীয় দেশগুলো। শিল্প খাত সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ডেটা সেন্টার ও নতুন প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ করছে এসব দেশ।

শত শত কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে খাতটিতে। তবে এসব উচ্চপ্রযুক্তির প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি মৌলিক সম্পদ এখন বড় বাধা হয়ে উঠছে। সেটি হলো পানি। খবর দ্য ন্যাশনাল।

উপসাগরীয় দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম পানি-সংকটাপন্ন অঞ্চল। সেখানে একদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের পানির চাহিদা। ফলে এআই ও শিল্পায়নের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পানির নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে বড় বিনিয়োগ করছে উপসাগরীয় দেশগুলো।

এ দৌড়ে এগিয়ে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। আরব বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি এআই অবকাঠামো তৈরিতে বড় বিনিয়োগ করছে। আবুধাবিতে তৈরি হচ্ছে ‘স্টারগেট ইউএই’। এটি ১ গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি বড় এআই সুপারকম্পিউটিং ও ডেটা সেন্টার প্রকল্প। এতে ব্যয় হতে পারে ৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি। ২০২৪-২৫ সালে ইউএইতে এআই-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের পরিমাণ ৫৪৩ বিলিয়ন দিরহাম বা ১৪ হাজার ৭৯০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। মাইক্রোসফট ও কেকেআরের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানও দেশটিতে বড় বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।

এআইয়ের জন্য প্রয়োজন বিশাল কম্পিউটিং সক্ষমতা। ডেটা সেন্টারে হাজার হাজার প্রসেসর ও গ্র্যাফিকস প্রসেসিং চিপ একসঙ্গে কাজ করে। এসব যন্ত্র প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। অতিরিক্ত তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজন হয় শীতলীকরণ ব্যবস্থা। এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে পানি।

ব্রুকিংসের তথ্য অনুযায়ী, একটি সাধারণ ডেটা সেন্টার প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ গ্যালন পানি ব্যবহার করতে পারে। এ পরিমাণ পানি প্রায় এক হাজার পরিবারের দৈনিক চাহিদার সমান। বড় ডেটা সেন্টারে পানির ব্যবহার আরো বেশি। এসব কেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ গ্যালন পর্যন্ত পানি লাগতে পারে, যা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার মানুষের একটি শহরের দৈনিক পানির চাহিদার সমান।

অর্থাৎ এআই অবকাঠামোর বিস্তার শুধু বিদ্যুৎ ও চিপের চাহিদা বৃদ্ধি করছে না। একই সঙ্গে বাড়াচ্ছে পানির প্রয়োজন। মরুভূমিপ্রধান উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এটি বড় বিষয়।

পানির সংকট মোকাবেলায় ইউএইর প্রধান ভরসা সমুদ্রের পানি পরিশোধন বা ডিস্যালিনেশন। দেশটির আবুধাবি জ্বালানি বিভাগের নিয়ন্ত্রকবিষয়ক মহাপরিচালক আবদুলআজিজ আল ওবাইদলি বলেন, ‘গত ৫০ বছর ডিস্যালিনেশন প্লান্টের মাধ্যমে নিরাপদ পানির নির্ভরযোগ্য উৎস তৈরি হয়েছে।’

এদিকে ইরান যুদ্ধের পর উপসাগরের সামুদ্রিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ আরো বেড়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, অগ্নিকাণ্ড ও তেল দূষণের মতো ঘটনা সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মার্চে বাহরাইন ও কুয়েতের ডিস্যালিনেশন প্লান্টে হামলার ঘটনাও এ অঞ্চলের পানি নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে।

ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের (ডব্লিউআরআই) অ্যাকুয়েডাক্ট ওয়াটার রিস্ক অ্যাটলাস অনুযায়ী, উপসাগরীয় দেশগুলো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পানি-চাপের মধ্যে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। বিশ্বের নবায়নযোগ্য মিঠা পানির মাত্র ২ শতাংশ রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। অঞ্চলটির ৮৩ শতাংশ এলাকা তীব্র পানিসংকটে রয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে অঞ্চলটির পুরো জনগোষ্ঠী তীব্র পানিসংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট।

পানির চাহিদা সামলাতে উপসাগরীয় দেশগুলো এরই মধ্যে বড় বিনিয়োগ করছে। ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬-২৪ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে ডিস্যালিনেশন সক্ষমতা বাড়াতে ৫ হাজার ৩৪০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। এটি বিশ্বে এ খাতে মোট মূলধনি ব্যয়ের প্রায় ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

২০২৮ সাল পর্যন্ত অঞ্চলে আরো ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রত্যাশা রয়েছে। আগামী দুই বছরে দৈনিক ডিস্যালিনেশন সক্ষমতা ৪ কোটি ১০ লাখ ঘনমিটারে পৌঁছতে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর পানির নিরাপত্তা ডিস্যালিনেশনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইউএইতে মোট পানির চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ ডিস্যালিনেশন থেকে আসে। কুয়েত ও ওমানে এ নির্ভরতা প্রায় ৯০ শতাংশ।

উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি সৌদি আরবও তেলনির্ভরতা কমাতে বড় পরিবর্তনের পথে রয়েছে। অবকাঠামো, আবাসন ও শিল্প প্রকল্পে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে দেশটি। পাশাপাশি এআই খাতেও বড় পরিকল্পনা রয়েছে।

কাতারও এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। কিউএআই নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করেছে দেশটি। এটি কাতার ও বিদেশে এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার কাজ করবে।

এআই অবকাঠামো যত বাড়বে, পানির চাহিদাও তত বাড়বে। একটি যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনের হিসাবে, শুধু ইউএইর এআই খাতেই ২০৩০ সাল নাগাদ বছরে প্রায় ৬ হাজার ১০০ কোটি লিটার পানির প্রয়োজন হতে পারে। একই সময় সৌদি আরবে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুতের চাহিদা বছরে ২৯ শতাংশ হারে বাড়তে পারে।

পানির ব্যবহার কমাতে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিভিন্ন কোম্পানি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে। আবুধাবির খাজনা ও সৌদি আরবের ডেটাভোল্ট ও আলফানারের মতো কোম্পানি তরলভিত্তিক শীতলীকরণসহ বিভিন্ন উচ্চ দক্ষতার প্রযুক্তি পরীক্ষা বা ব্যবহার করছে।

আরও