শাড়ির আঁচল গুটিয়ে নিয়েছেন। পায়ের স্যান্ডেল বারবার খুলে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত স্যান্ডেল দুটো খুলেই ফেললেন। তারপর খালি পায়ে ছুটলেন ৪৭ বছরের রামাবাই রানভীর। কোনো প্রশিক্ষণ নেই, দৌড়ানোর জুতাও নেই। ছিল শুধু সংকল্প—দৌড় প্রতিযোগিতায় জিতে পাওয়া ৩ হাজার রুপি দিয়ে মেয়েদের পড়াশোনার খরচে কিছুটা সহায়তা করা। ভারতের মহারাষ্ট্রের বীড জেলার এ বিধবা নারী শেষ পর্যন্ত ৩ কিলোমিটারের দৌড়ে প্রথম হয়ে পুরস্কারটি জিতেই নেন।
ঘটনার শুরু বড় মেয়ে পূজার একটি আবদার থেকে। এক সকালে সে মাকে জানায়, কাছেই একটি দৌড় প্রতিযোগিতা হচ্ছে। জিততে পারলে পুরস্কারের টাকা পাওয়া যাবে, যা তার পড়াশোনায় কাজে লাগবে। ছোট মেয়ে আরতি তখন নান্দেড়ে থাকেন। বই কেনার টাকা জোগাড় করতে না পারায় মায়ের সঙ্গে টানা আট দিন ফোনেও কথা বলেননি। মেয়ের সে কষ্টই রামাবাইকে দৌড়ে নামার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
বড় মেয়ে পূজার সঙ্গে রামাবাই রানভীর
প্রতিযোগিতার দিন স্যান্ডেল খুলে খালি পায়ে দৌড় শুরু করেন তিনি। ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সী নারীদের বিভাগে সবার আগে ফিনিশিং লাইন ছুঁয়ে যান। বড় মেয়ে পুজাও নিজের বয়স বিভাগে দ্বিতীয় হয়ে পুরস্কার পান। তবে মায়ের সাহসকেই নিজের সাফল্যের চেয়ে বড় করে দেখেছেন তিনি।
রামাবাইয়ের এ লড়াই অবশ্য এক দিনের নয়। ২০১২ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তিনিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অন্যের জমিতে সয়াবিন ও ছোলা তুলেছেন, হলুদ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করেছেন। এখন যে কোচিং সেন্টারে এক মেয়ে পুলিশ নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, সেখানেই রান্নার কাজ করেন তিনি।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছিল রামাবাইকে। তাই নিজের অপূর্ণতার জায়গাটি মেয়েদের জীবনে রাখতে চান না। তার দুই মেয়ে একজন পুলিশ নিয়োগ এবং অন্যজন সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এসব পরীক্ষায় সফল হতে ভারতের লাখো তরুণ বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন, কোচিং ও পড়াশোনার পেছনে ব্যয় করেন বিপুল অর্থ। এর সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নানা অনিয়মের অভিযোগে শিক্ষা ও নিয়োগব্যবস্থা নিয়েও তৈরি হয়েছে হতাশা।
রামাবাইয়ের এ দৌড়ের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই সামনে আসে তার জীবনের গল্প। ৩ হাজার রুপি অর্থের অঙ্কে বড় কিছু নয়। ভারতের উচ্চশিক্ষার খরচ তো দূরের কথা, সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির কোচিং বা বইয়ের খরচও এতে খুব বেশি মেটার কথা নয়। তবু মেয়েদের পড়াশোনার জন্য একজন মায়ের এমন দৌড় ভারতের শিক্ষা ও চাকরির বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তার দৌড়ের খবর কর্তৃপক্ষের নজরেও এসেছে। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্থানীয় কর্মকর্তাদের রামাবাইকে ৫০ হাজার রুপি আর্থিক সহায়তা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
তবে রামাবাইয়ের কাছে অর্থের চেয়ে বড় তার দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ। তার নিজের ভাষায়, জীবনে যে কষ্ট তিনি পেয়েছেন, মেয়েদের যেন সেই কষ্ট পেতে না হয়। তাই সেদিন সন্তানের উজ্জল ভবিষ্যতের আশায় শাড়ি গুটিয়ে, স্যান্ডেল খুলে, খালি পায়ে ছুটেছিলেন তিনি।
সূত্র: বিবিসি