ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা উপস্থিতি কমিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে দেশটির প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে চলমান এসব অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় অঞ্চলটিতে মোতায়েন জনবল ও স্থায়ী স্থাপনার সংখ্যা কমানোর বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা দেয়া হয়নি।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ও গোয়েন্দা উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বাড়ায়। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইরান, ইয়েমেন ও লিবিয়ায় যুদ্ধ, অভিযান ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অঞ্চলজুড়ে গড়ে তোলা হয় বিভিন্ন স্থায়ী সামরিক ও গোয়েন্দা স্থাপনা। তবে সাম্প্রতিক ইরান সংঘাতে এসব স্থাপনার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইরানের বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্য হয়েছে মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা। এ সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৮ মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি দুটি বিমানবাহী রণতরী ও এক ডজনের বেশি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারসহ বড় ধরনের সামরিক সক্ষমতা সেখানে রাখা হয়েছে। সংঘাতের সবচেয়ে তীব্র সময়ে অঞ্চল থেকে সরিয়ে নেয়া কিছু সিআইএ কর্মকর্তাকেও আবার ফেরত পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেসব সেনা ও স্থাপনা মধ্যপ্রাচ্যে থাকবে, সেগুলোর নিরাপত্তা বাড়ানোর উপায়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু স্থাপনা ভূগর্ভে সরিয়ে নেয়ার চিন্তাও রয়েছে।
সামরিক পরিকল্পনাকারীরা আগামী বছর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বাহিনীর কাঠামো পরিবর্তনের কয়েকটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা তৈরি করেছেন। তবে চলমান সংঘাতের মধ্যে বিমান অভিযান পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলো ছেড়ে দেয়া বাস্তবসম্মত হবে না বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি স্থাপনা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রিয়াদে সিআইএর একটি আউটপোস্ট কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে বলে একজন মার্কিন কর্মকর্তা ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন। বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতের মার্কিন সামরিক স্থাপনাও ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার সবগুলো পুনর্নির্মাণ করা হবে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কিছু স্থাপনা আর না বানানোর কথাও ভাবছেন কর্মকর্তারা।
সিআইএ ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশেষ অভিযান ইউনিটের ক্ষেত্রেও স্থায়ী ঘাঁটির বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। একটি ধারণা হলো, সংবেদনশীল দায়িত্বে থাকা সদস্য ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম যুক্তরাষ্ট্রেই রাখা হবে; নির্দিষ্ট অভিযানের প্রয়োজন হলে তাদের মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হবে এবং কাজ শেষে আবার দেশে ফিরিয়ে নেয়া হবে।
এদিকে পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমিয়ে আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আরো বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ‘ফোর্স পোস্টার রিভিউ’ শুরু হয়নি। কর্মকর্তারা মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভবিষ্যতে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করতে পারেন, তা বিবেচনায় রেখে সম্ভাব্য বিকল্প প্রস্তুত করছেন।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে সামরিক উপস্থিতি কমানোর চেষ্টা অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন নয়। ১৯৯৮ সাল থেকেই অঞ্চলটিতে প্রায় ২৭ হাজার সক্রিয় সেনা ছিল। ইরাক আক্রমণের সময় ২০০৩ সালে এ সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখে পৌঁছায়। ২০০৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত অঞ্চলটিতে মার্কিন সেনার সংখ্যা কখনোই প্রায় এক লাখের নিচে নামেনি। পরে সংখ্যা কমলেও দীর্ঘ সময় তা ৩০ থেকে ৬০ হাজারের মধ্যে ছিল।
তবে নতুন করে সেনা কমানোর আলোচনা শুরু হলেও ইরানের সঙ্গে সংঘাত কখন শেষ হবে, তার কোনো স্পষ্ট সময়সীমা নেই। পেন্টাগন কর্মকর্তারা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু বড় ও স্থায়ী ঘাঁটি বহাল থাকবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পুনর্নির্মাণে স্বাগতিক দেশগুলো কতটা অর্থ দিতে রাজি হবে, তার ওপরও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ভর করতে পারে। এর মধ্যে ইরানের হামলার ঝুঁকিও বহাল রয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান সম্প্রতি জানিয়েছেন, পঞ্চম নৌবহরের ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটি বাহরাইনে মার্কিন সদস্যদের শিগগিরই ফেরার সম্ভাবনা নেই। সিএনএন