ইরানের বিরুদ্ধে আবারো বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো দ্বিধায় রয়েছেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস।
মধ্যপ্রাচ্যে শিগগিরই তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন হতে যাচ্ছে। একই সময়ে ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, জ্বালানি স্থাপনা এবং অন্যান্য সামরিক স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা তৈরি করছে পেন্টাগন।
তবে এর আগে একাধিকবার ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন ট্রাম্প। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ইরান তেলবাহী জাহাজে হামলা বাড়ালেও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক সীমিত রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালানো হবে না। দুই দেশের মধ্যে ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ চলছে বলেও জানান তিনি।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক মাসে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দল ও পেন্টাগন ইরান অথবা ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর জন্য পাঁচটি প্রস্তাব দিয়েছিল। প্রতিবারই ট্রাম্প এসব পরিকল্পনা বাতিল করেন। তবে এবার আবার হামলার বিকল্প পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার ক্যাম্প ডেভিডে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে আলোচিত পরিকল্পনায় প্রায় তিনদিন ধরে স্বল্পমেয়াদি কিন্তু তীব্র হামলার কথা রয়েছে। এ হামলার মূল লক্ষ্য হবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভাণ্ডার। এ ছাড়া ইরানের জ্বালানি স্থাপনা এবং রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ড পোস্ট ও সদর দপ্তরও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এর আগে অ্যাক্সিওস এসব হামলা পরিকল্পনার খবর প্রকাশ করেছিল।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অচলাবস্থা
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, কূটনৈতিক আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে বলে ট্রাম্পের মূল্যায়নকে তারা সমর্থন করেন। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এখনো চলছে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বারবার অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা করতে চায়। অন্যদিকে ইরানি আলোচকেরা বলছেন, এ বিষয়টি আলোচনার শেষ পর্যায়ে আসা উচিত।
এদিকে গত কয়েক মাসে ইরান সামরিক কৌশল উন্নত করায় দেশটির হামলা ঠেকানো আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে এখন আগের তুলনায় বেশি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। এতে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর চাপ বাড়ছে।
গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিদের মতে, চীনা কোম্পানিগুলোর সরবরাহ করা স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করে ইরান মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে আরো নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে পারছে।
তেলবাহী জাহাজে হামলা বাড়িয়েছে ইরান
ব্রিটিশ নৌবাহিনী পরিচালিত একটি পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর থেকে ইরান অন্তত ১৩টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আক্রান্ত জাহাজের সংখ্যা প্রায় ২০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হামলার কোনোটির বিরুদ্ধেই যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
ফলে সাম্প্রতিককালে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রফতানি তুলনামূলকভাবে বাড়লেও ইরানের হামলা জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে জ্বালানি পরিবহন কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আগে আন্তর্জাতিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাবে নিয়মিত পাল্টা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রতিক্রিয়া অনেকটাই কমেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এর পেছনে ট্রাম্পের পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে অনীহা কাজ করছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা কমছে না
ইরানের হামলা নিয়ে মার্কিন সামরিক কমান্ডাররাও উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের ঘাঁটি, জ্বালানি স্থাপনা এবং অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামোয় ইরানের হামলা ঠেকানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বৃহস্পতিবারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেসব তেল যাচ্ছে, তার কোনোটি ইরান থেকে আসছে না।
তবে অনেক কর্মকর্তাই এ দাবির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তাদের মতে, ইরান কিছু জাহাজকে ফি দেয়ার বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেয়। এসব জাহাজের কিছুতে ইরানের তেলও থাকতে পারে।
বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের নিজস্ব একটি ‘ছায়া বহর’ বা গোপন ট্যাংকার বহরও রয়েছে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের মধ্যেও সংশয়
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কিছু কর্মকর্তার মধ্যেও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে সংশয় বাড়ছে। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, সামরিক হামলায় ইরানের অবস্থান বা পরিকল্পনা বদলানো কঠিন হবে। তাদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক চাপের নীতি কাজ করছে এবং ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দিতে বাধ্য করার জন্য আরো সময় দেওয়া প্রয়োজন।
এর আগে ট্রাম্প নভেম্বরের নির্বাচনের আগে হামলা না করার ঘোষণা দেয়ার আগেই মার্কিন কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, ইসরায়েলের ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন এবং পরের সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।
তবে প্রেসিডেন্ট আবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বড় ধরনের অভিযান শুরু করার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে তিন বিমানবাহী রণতরী
মার্কিন নৌবাহিনীর থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরী বহর গত সপ্তাহে সান দিয়েগো ছেড়েছে। অক্টোবরের শেষ নাগাদ এটি জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও জর্জ ওয়াশিংটন বিমানবাহী রণতরীর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। প্রতিটি বহরে হামলা চালাতে সক্ষম হেলিকপ্টার ও মেরিন সেনাসহ অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। ২০০৩ সালের পর এই প্রথম মধ্যপ্রাচ্যে একসঙ্গে তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন হতে যাচ্ছে।
জানা গেছে, চলতি মাসের শেষে সমুদ্রে ২০ হাজারের বেশি মার্কিন নৌসেনা ও মেরিন সদস্য এবং শত শত সামরিক বিমান থাকবে। তবে এ মাত্রার সেনা মোতায়েন স্থায়িত্ব সীমিত হতে পারে। কেননা রুজভেল্ট পৌঁছানোর পর জর্জ ওয়াশিংটনকে জাপানের ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নেয়ার কথা রয়েছে। তবে এত বড় সামরিক প্রস্তুতি সত্ত্বেও নির্বাচনের পর ট্রাম্প নতুন হামলার অনুমতি দেবেন কি না, তা নিশ্চিত নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি রক্ষায় ব্যবহৃত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আরো কমে যাওয়া নিয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন। ইরানের হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়েও তাদের উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর পক্ষে থাকা কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাদের মতে, স্বল্পমেয়াদি কিন্তু তীব্র হামলা ইরানের ওপর আরো চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে ইরানের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশটির ওপর চাপ বাড়বে।
যুদ্ধের শুরুতে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সাধারণত দুটি করে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করত মার্কিন বাহিনী। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষেত্রেই এ ব্যবস্থা নেয়া হতো। তবে এখন ইরানের উন্নত সামরিক কৌশল ও লক্ষ্য নির্ধারণের সক্ষমতার কারণে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের বহর ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের আরো বেশি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে হচ্ছে।
মার্কিন কমান্ডাররা বলছেন, যুদ্ধের কারণে অস্ত্রের মজুত কমে গেলেও তাদের হাতে এখনো কিছু প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত রয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়া থেকেও অতিরিক্ত অস্ত্র এনে মজুত বাড়িয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড।