সিএনএনের বিশ্লেষণ

ডানপন্থীদের প্রভাব, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক চাপ সামলাতে হবে লুলাকে

আইন প্রণয়নে লুলাকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। প্রতিনিধি পরিষদের ৫১৩টি আসনের ডানপন্থীদের আসন ৩০৩টি। বামপন্থীদের আসন ১২৪ এবং মধ্যপন্থীদের ৮৬। সিনেটেও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন ডানপন্থীদের দখলে থাকবে। ফলে লুলার জন্য নিজের রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে জোট গঠন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চতুর্থ মেয়াদে অভূতপূর্ব বিজয়ের মাধ্যমে ইতিহাস গড়েছেন বামপন্থী লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ৮১তম জন্মদিনের কয়েক দিন আগে পাওয়া এ বিজয় তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। প্রথম দফার ভোটে ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর কাছে পিছিয়ে থাকলেও দ্বিতীয় দফায় ব্যবধান উল্টে দেন তিনি। তবে নির্বাচনী সাফল্যের বিপরীতে নতুন মেয়াদে সরকার পরিচালনায় বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন লুলা। জাতীয় কংগ্রেস ও রাজ্য সরকারগুলোয় ডানপন্থীদের শক্তিশালী অবস্থান তার নীতিমালা বাস্তবায়ন কঠিন করে তুলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত।

সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১৯৮৫ সালে ব্রাজিলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর প্রথম দফায় পরাজিত হয়ে দ্বিতীয় দফায় কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর বিজয়ের নজির নেই। দুই দফা ভোটের মধ্যবর্তী তিন সপ্তাহে লুলার ভোট বেড়েছে এক কোটির বেশি। বিপরীতে বলসোনারোর ভোট বেড়েছে ৩৬ লাখ। ২০২২ সালে ফ্লাভিওর বাবা ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোকে পরাজিত করার চেয়েও এবার বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন লুলা।

যদিও এ বিজয় ডানপন্থীদের রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে পারেনি। আইন প্রণয়নে লুলাকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। প্রতিনিধি পরিষদের ৫১৩টি আসনের ডানপন্থীদের আসন ৩০৩টি। বামপন্থীদের আসন ১২৪ এবং মধ্যপন্থীদের ৮৬। সিনেটেও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন ডানপন্থীদের দখলে থাকবে। ফলে লুলার জন্য নিজের রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে জোট গঠন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।

রাজ্য সরকারগুলোতেও রক্ষণশীলদের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। দুই দফার নির্বাচনে বলসোনারোর লিবারেল পার্টি পাঁচটি গভর্নর পদ পেয়েছে। রিপাবলিকানস ও প্রগ্রেসিভ পার্টি পেয়েছে চারটি করে। লুলার ওয়ার্কার্স পার্টিও চারটি গভর্নর পদ পেয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের নেতাদের নিয়ে গঠিত সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি পেয়েছে পাঁচটি। নীতিমালা বাস্তবায়নে এসব রাজ্যের সরকারের সহযোগিতাও প্রয়োজন হবে। বিজয়ী ভাষণে লুলা বলেন, নির্বাচনে জয়ের পর আর কোনো প্রতিপক্ষ থাকে না; তাকে ২১ কোটি ৫০ লাখ মানুষের জন্য সরকার পরিচালনা করতে হবে। কংগ্রেসের গঠন নিয়েও তিনি বলেন, জনগণই এ কংগ্রেস নির্বাচন করেছে এবং এর সঙ্গেই তাকে কাজ করতে হবে।

নতুন মেয়াদে লুলার তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। নির্বাচনী প্রচারে অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ তার সমর্থন কমার অন্যতম কারণ ছিল। মূল্যস্ফীতি কমলেও পণ্যের দাম আগের পর্যায়ে ফিরে আসে না। কর্মসংস্থানের উন্নতিও পরিবারের ঋণ ও দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ পুরোপুরি কমাতে পারে না।

সরকারি ঋণ, বাজেট ঘাটতি ও উচ্চ সুদহার সরকারি ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করবে। সামাজিক কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত না করে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অর্থ জোগাড় করাও কঠিন হতে পারে। বিরোধীদলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে কংগ্রেসে ব্যয় ও রাজস্ব-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে সমঝোতার চাপও থাকবে।

অপরাধ দমনেও কঠোর পদক্ষেপের দাবি মোকাবেলা করতে হবে লুলাকে। নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে ফৌজদারি দায়বদ্ধতার বয়স ১৬ বছরে নামিয়ে আনার পক্ষে তার অবস্থান সেই চাপেরই প্রতিফলন। তবে এ বিষয়ে তিনি বাস্তব কোনো প্রস্তাব দেবেন কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে বামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলটির সাফল্য এখনো অনেকাংশে লুলার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল।

লুলার জয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-সমর্থিত ডানপন্থী প্রার্থীদের ধারাবাহিক সাফল্যে বিরতি এনেছে। লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির নেতৃত্বে থাকা ব্রাজিলের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার চীন। ওয়াশিংটনের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবেলায় ব্রাজিল নিজের অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে আসছে। লুলার পরাজয় হলে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তার এবং চীনের উপস্থিতি সীমিত করার প্রচেষ্টায় বড় পরিবর্তন আসতে পারত বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে আঞ্চলিক রাজনীতির পরিবর্তনের কারণে লুলা আগের তুলনায় কম মিত্র পেতে পারেন। ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ও সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির গবেষক মাইকেল পার্লবার্গ সিএনএনকে বলেন, ‘লুলা যখন প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন লাতিন আমেরিকায় বামপন্থীদের উত্থানের সময় ছিল এবং তার আঞ্চলিক মিত্রও বেশি ছিল। বর্তমানে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে।’ পার্লবার্গের মতে, আঞ্চলিক রাজনৈতিক মিত্রের অভাবে লুলা দক্ষিণ আমেরিকান রাষ্ট্রগুলোর জোট ইউনিয়ন অব সাউথ আমেরিকান নেশনসের পেছনে আগের মতো রাজনৈতিক শক্তি ব্যয় নাও করতে পারেন। বরং বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বাণিজ্য জোট মারকোসুরের মাধ্যমে ব্রাজিলের অর্থনৈতিক প্রভাব কাজে লাগাতে পারেন।

চতুর্থ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে লুলাকে সতর্ক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। পার্লবার্গের ভাষ্য, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে লুলা কখনো কঠোর সমালোচনা, কখনো সমঝোতামূলক অবস্থান নিয়েছেন। তার কাছে সার্বভৌমত্ব মানেই সংঘাত নয়। তিনি আদর্শগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী নন এবং ডানপন্থী সরকারের সঙ্গেও কাজ করতে তার আপত্তি নেই।

যুক্তরাষ্ট্রর আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন লুলা। ওই নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নীতিমালা আরো বেশি নজরদারির মুখে পড়তে পারে, যা লুলার কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। পার্লবার্গের মতে, লুলার জয় দেখিয়েছে যে বলসোনারোর আন্দোলনসহ কট্টর ডানপন্থীদের সমর্থনেরও সীমা রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ কোনো নির্বাচনের ফল নির্ধারণে এককভাবে নিয়ামক নয় বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে এ ফল।

ইতিহাস গড়ার পর নতুন মেয়াদ শুরুর আগে দুই মাস সময় পাচ্ছেন লুলা। এ সময়ে তাকে ঠিক করতে হবে, আগামী চার বছরে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশটির অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আঞ্চলিক সম্পর্ক কোন পথে এগিয়ে নেবেন।

আরও