প্রতিদিনের মতো গত বুধবার সকালে দুই ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে বাড়িতে তাঁতের কাজে বসেছিলেন ২৮ বছরের মাতি মায়া তামাং। হঠাৎ ভূমিকম্পের মতো বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখের সামনে কাদা আর পানির নিচে তলিয়ে যায় চারপাশের ঘরবাড়ি, বাজার ও স্কুল এলাকা। ১৫ থেকে ২০ মিনিটের দূরত্বে থাকা সন্তানদের স্কুলে গিয়ে দেখেন পুরো ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। ওইদিনের বন্যায় দুই সন্তানকেই হারিয়ে ফেলেছেন বলে ধরে নিয়েছিলেন মাতি মায়া ।
নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে চারদিকে যখন হাহাকার, ঠিক তখনই এক অলৌকিক ও আবেগঘন পুনর্মিলনের সাক্ষী হলো রাজধানী কাঠমান্ডু। গাছে চড়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া আট বছরের ছেলে জয়াল ঘালে শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছে মায়ের কোলে।
সেদিন লংতাং লিরুং পর্বতচূড়ার কাছের হিমবাহ ধসে পাথর, বরফ ও কাদার প্রবল ঢল নেমে আসে উত্তর নেপালের রসাওয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলায়। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, এ বিপর্যয়ে অন্তত ১৭ হাজার শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে এ পর্যন্ত ৬৩৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং প্রায় আড়াই হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
ভয়াবহ এ দুর্ঘটনার পর তামাংয়ের ছোট ছেলেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে উদ্ধারকারীরা। তবে বড় ছেলে জয়াল ঘালের খবর মিলছিল না। একে একে তিনটি ত্রাণ ও তালিকা কেন্দ্র ঘুরে সন্তানদের নাম না পেয়ে শেষ আশাটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন তামাং। তিনি বলেন, আমি চার চারটি জায়গায় খুঁজেছি, কিন্তু কোথাও সন্তানদের নাম ছিল না। তখন ধরে নিয়েছিলাম যে আমার দুই ছেলেই আর বেঁচে নেই। চোখের পানি ফেলা ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না। আমি নিজেকে কোনোভাবেই সামলাতে পারছিলাম না।
অন্যদিকে জয়ালকে ভাঙা পা ও মুখে আঘাতসহ উদ্ধার করে নুয়াকোটের এক ছোট হাসপাতালে ভর্তি করেছিল উদ্ধারকর্মীরা। সেখানে কোনো স্বজনের খোঁজ না পেয়ে শিশুটির একটি ভিডিও রেকর্ড করেন রয়টার্সের সাংবাদিক সাহানা বাজরাচার্য। হাসপাতালে নিজের যোগাযোগের নম্বরও রেখে আসেন।
বৃহস্পতিবার ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে তামাং জানতে পারেন তার বড় ছেলেও বেঁচে আছে এবং তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুতে স্থানান্তর করা হয়েছে। রয়টার্স দলের সহায়তায় শুক্রবার কাঠমান্ডুর হাসপাতালে পৌঁছে ছেলের পাশে গিয়ে দাঁড়ান মাতি মায়া।
হাসপাতালে সাংবাদিকরা প্রথম যখন জয়ালকে দেখেন, তখন তার ভাঙা ডান পা ব্যান্ডেজ করা ছিল এবং বাঁ হাতে শক্ত করে ধরে রাখা ছিল ১০ রুপির দুটি নোট। ভয় পেয়ে হাসপাতালে যেতে রাজি না হওয়ায় উদ্ধারকারী পুলিশ সদস্যরা তাকে শান্ত করতে এই ২০ রুপি দিয়েছিলেন।
ভয়াবহ সেই মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে আট বছরের জয়াল জানায়, হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে এলে সে এক বন্ধুর সঙ্গে দৌড়ে পাশের বনে চলে যায় এবং প্রাণ বাঁচাতে গাছে উঠে পড়ে। ভয় পেয়েছিল কি না জানতে চাইলে ছোট্ট জয়াল সোজা মাথা নেড়ে জানায়, না, একদম না।
জয়ালের বাবা জাপানে এক নির্মাণ সংস্থায় কর্মরত। সন্তানকে দিরে পাওয়ার খবর পেয়ে দেশের পথে রওনা হয়েছেন তিনি। ভয়াবহ এ প্রাকৃতিক বিপর্যয় রসাওয়া অঞ্চলের মানচিত্র বদলে দিলেও ছেলেকে ফিরে পেয়ে মাতি মায়া তামাংয়ের মুখে হাসি ফুটেছে। ছেলের দুষ্টুমির স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ও বরাবরই খুব চঞ্চল একটা বাচ্চা। হাড় ভাঙা ওর জন্য এই প্রথম নয়!