নেপালে আকস্মিক বন্যার নয়দিন পর ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গ থেকে দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে আরো মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় উদ্ধারকারীরা। খবর সিএনএন, বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান।
নেপালের ত্রিশুলি নদীর তীরবর্তী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোয় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের নাগরিকসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিকরা কাজ করছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জনকে উদ্ধার করা হলেও আরো ৫০০ জনের মতো এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
আজ শুক্রবার সকালে ওই সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে আটকে পড়া প্রথম ব্যক্তি সঞ্জয় শাহকে জীবিত উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসা হয়। স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত ছবিতে প্রথম উদ্ধার হওয়া শ্রমিককে কাদায় মাখা অবস্থায় দেখা যায়। একজন উদ্ধারকারী তাকে কাঁধে করে সুড়ঙ্গ থেকে বাইরে নিয়ে আসেন। পরে তাকে ত্রিশুলিতে নেপাল সেনাবাহিনীর ব্যারাকে নেয়া হয়।
সে সময় নুয়াকোট জেলার পুলিশপ্রধান বিপিন রেগমি জানান, ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গ থেকে ওই শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, উদ্ধারকারীরা মানুষের কণ্ঠ শুনতে পেয়েছেন। ঘটনাস্থলে একটি চিকিৎসক দলও পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
ত্রিশুলি নদীর তীরে অবস্থিত এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রে যাওয়ার সুড়ঙ্গটির দৈর্ঘ্য চার কিলোমিটারের (প্রায় ২ দশমিক ৫ মাইল) বেশি। সেখানে নিখোঁজ ৪২ শ্রমিককে উদ্ধারে সুড়ঙ্গ খননের মাধ্যমে তল্লাশি চালানো হচ্ছিল।
এর কিছুক্ষণ পরই কবির মহার্জন নামে আরেক শ্রমিককে সুড়ঙ্গ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। বাসনেট জানান, সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রায় ১৭০ মিটার গভীরতা থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া বিপিন রেগমির পাশাপাশি স্থানীয় আইনপ্রণেতা শ্রী রাম নেউপানেও ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির একটি ছবিও প্রকাশ করেন। ছবিতে ওই ব্যক্তিকে স্ট্রেচারে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। তার মুখে অক্সিজেন মাস্ক ছিল।
উদ্ধার হওয়া সঞ্জয় শাহ আপার ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ফোরম্যান এবং কবির মহার্জন সেখানে সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। কবির মহার্জনকে উদ্ধারের খবর পেয়ে তার ভাই আমির মহার্জন বলেন, তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। আমার বুকটা এখন অনেক হালকা লাগছে। আমাদের পুরো পরিবারই খুব খুশি।
নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সুরেশ রাউত জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গটির ভেতরে এখনো ৩৯ জন শ্রমিক থাকতে পারে বলা ধারণা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে তাদের মধ্যে কতজন এখনো জীবিত রয়েছেন, তা নিশ্চিত করতে পারেনি তারা। রাউত আরো জানান, উদ্ধার হওয়া দুই শ্রমিককে সরাসরি হেলিকপ্টারে করে রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।
এদিকে উদ্ধার হওয়া দুই শ্রমিকের হাত ও পায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বের হওয়ার সময় এসব আঘাত লেগে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির (এনইএ) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকায় তারা অক্সিজেনের ঘাটতিতেও ভুগছেন।
ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গ ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের কণ্ঠ শুনেছেন উদ্ধারকারীরা। তারা আটকে পড়াদের উদ্দেশ্যে বলেন, আতঙ্কিত হবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করছি। জবাবে ভেতর থেকে একজন বলেন, ঠিক আছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নেপালের ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে প্রায় ৯০০ শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে আনুমানিক ৫০০ জন সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন তাই সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের ধারণা, সুড়ঙ্গের ভেতরে বাতাস থাকায় এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে শ্রমিকরা জীবিত থাকতে পারেন।
ঘন কাদার কারণে আপার ত্রিশুলি-৩এ প্রকল্পের সুড়ঙ্গের অবস্থান শনাক্ত করতেই প্রায় ছয় দিন সময় লেগেছে উদ্ধারকারীদের। কর্তৃপক্ষের ধারণা, সুড়ঙ্গটির ভেতরে এখনো ৩০ থেকে ৪০ জন মানুষ জীবিত থাকতে পারেন।