নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে একটি সুড়ঙ্গে নয় দিন আটকে থেকেও বেঁচে ছিলেন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের দুইজন শ্রমিক। গত ৪ সেপ্টেম্বর তাদের উদ্ধার করা হয়। খবর রয়টার্স।
গত ২৬ আগস্ট নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকায় হিমবাহ ধসে কাদা ও পানির বিশাল ঢল নামে। এতে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং হাজারো মানুষ নিখোঁজ হন। উপত্যকার ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রায় ৯০০ কর্মীও এতে আটকা পড়েন।
দুর্যোগের দিন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে এই শ্রমিকদের একজন কাজে যাওয়ার আগে তার স্ত্রীকে ফোন করে জানান, তাকে সুড়ঙ্গে ঢুকতে হবে এবং সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকবে না। প্রায় এক ঘণ্টা পর লাংটাং লিরুং পাহাড়ে হিমবাহ ধসে শক্তিশালী ভূমিধস শুরু হয়। পানির ঢল গ্রাম ভাসিয়ে দিয়ে প্রকল্পগুলো ডুবিয়ে দেয়।
রাজধানী কাঠমান্ডুতে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা একে একে প্রকল্পগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হতে দেখেন। প্রথমে তারা বিষয়টি স্বাভাবিক বন্যা ভেবেছিলেন। পরে প্রায় ৪০ কর্মীকে নিরাপদ দুরত্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ পাঠানো হয়। এরপর আবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে চূড়ান্তভাবে সবাইকে বের হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
এ সময় সুড়ঙ্গে থাকা কর্মীরা নিরাপদ জায়গা খুঁজতে গিয়ে ছুটে পালান। ছোটাছুটিতে প্রায় ৩০ জনকে পানির ঢলে ভেসে যেতে দেখা যায়। পরে একটি জরুরি সিঁড়ির সন্ধান মেলে, যা আগে জানা থাকলে ভেতরের দুই-তৃতীয়াংশ কর্মী বাঁচতে পারতেন।
চারটি প্রবেশপথের মধ্যে একটি ১৮০ মিটারের বেশি দীর্ঘ হয়ে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছেছে। সেটি পুরোপুরি পানিতে ডুবে গেছে বলে ধারণা করা হয়। তবে অপেক্ষাকৃত ছোট, ঢালু একটি তারের নালির সুড়ঙ্গে দুই শ্রমিক আশ্রয় নেন। এটি ছিল বের হওয়ার পথ থেকে ১৬০ মিটার দূরে।
পরবর্তী নয় দিন তারা কাদামিশ্রিত পানির মধ্যে থাকা বাতাসের ফাঁকা জায়গায় আটকে ছিলেন। একজন সাহস ধরে রাখতে নিজ ধর্মের প্রার্থনা করতেন। অন্যজন বেঁচে থাকার জন্য কাদামিশ্রিত পানি পান করতেন।
এদিকে উদ্ধারকারীদের কাজও ছিল কঠিন। প্রায় ৭ হাজার ৫০০টির বেশি বাড়ি ধ্বংস হওয়ায় কোথায় আগে খনন করা হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তিন দিন পর খনন শুরু হয়। কাদা, পাথর, কাঠ ও ধ্বংসাবশেষের ১৫-৩০ মিটার স্তর সরাতে ড্রিলিং, নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ও ভারী যন্ত্র ব্যবহার করা হয়।
উপর থেকে ৫ ইঞ্চি ব্যাসের একটি ছিদ্র করে সুড়ঙ্গের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। বৃষ্টিতে বারবার পানি ও ধ্বংসাবশেষ ফিরে আসায় উদ্ধারকাজ পিছিয়ে যায়। প্রায় ছয় দিন পর সুড়ঙ্গের চাপা পড়া প্রবেশপথে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
উদ্ধারের আগের রাতে উদ্ধারকারীরা ১৫ মিটার ওপরে থাকা একটি প্রাকৃতিক নালিতে উচ্চচাপের পানি প্রবাহিত করে ৪-৫ মিটার পথ পরিষ্কার করেন। পরে আবার বৃষ্টিতে ধস নামে এবং কয়েকজন উদ্ধারকারীও আটকা পড়েন।
নেপালে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুড়ঙ্গে সারভাইভার বা বেঁচে থাকা মানুষদের সন্ধান ও মরদেহ উদ্ধারে কাজ করছেন অনুসন্ধানী ও উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা
দশম দিনের ভোর ৪টার দিকে যন্ত্রচালকরা ভেতর থেকে শব্দ শুনতে পান। বারবার যন্ত্র বন্ধ করে তারা ডাকতে থাকেন। একপর্যায়ে আলোয় একটি হাত দেখা যায়। সকাল ৭টার দিকে ছোট একটি পথ খুললে ভেতর থেকে শোনা যায়, ‘আমরা এখানে আছি।’
দুই শ্রমিককেই দুর্বল অবস্থায় বের করা হয়। একজনকে কাঁধে করে এবং অন্যজনকে স্ট্রেচারে বের করা হয়। তাদের সন্তানরা বাবাকে ফিরে পেয়ে আনন্দে চিৎকার করে ওঠে। পরদিন আরেকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে চীনের এক নাগরিককেও জীবিত পাওয়া যায়।
হাসপাতালে এক শ্রমিকের পায়ের গভীর সংক্রমিত ক্ষতে অস্ত্রোপচার করা হয়। উদ্ধারের পর ওই শ্রমিক হাসপাতালে নিজের স্ত্রীকেও চিনতে পারেননি। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন আছেন এবং তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।