ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে গাজায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারানো হাজারো ফিলিস্তিনি নতুন করে জীবন গড়ার জন্য কঠিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এ উপত্যকায় জরুরি প্রস্থেটিক লিম্বের (কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সরঞ্জাম) তীব্র সংকট এবং চিকিৎসা সহায়তার সংকট তাদের দুর্ভোগকে আরো বাড়িয়ে তুলছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। খবর এপি।
হামলায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারানোর তালিকায় একজন হলেন হানিন আল-মাবহুহ। গাজার মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত তার মা-বাবার বাড়িতে হুইল চেয়ারে বসে তিনি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার স্বপ্ন দেখেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মধ্য গাজার নুসেইরাতে তাদের বাড়িতে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। এ হামলায় ঘুমন্ত অবস্থায় পুরো পরিবার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে। তার চার কন্যা নিহত হয়, যাদের মধ্যে একজনের বয়স ছিল মাত্র পাঁচ মাস। ধ্বংসস্তূপের নিচে পিষ্ট হয়ে তার পা ভেঙে যাওয়ায় চিকিৎসককে তার ডান পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলতে হয়।
হানিন বলেন, ‘দেড় বছর ধরে আমার জীবন থমকে আছে।’ উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে গাজার বাইরে নেয়ার তালিকায় রাখা হলেও এখনো অনুমতি মেলেনি।
ডব্লিউএইচওর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় গাজায় পাঁচ-ছয় হাজার মানুষ অঙ্গ হারিয়েছে। তাদের প্রায় ২৫ শতাংশই শিশু। অধিকাংশই কৃত্রিম পা, হুইল চেয়ার ও পুনর্বাসন পরিষেবার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করছেন।
দুই মাসের বেশি সময় ধরে যুদ্ধবিরতি চললেও আহতদের দুর্ভোগ কমেনি। জাতিসংঘ জানায়, প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি বিদেশে গুরুতর চিকিৎসার জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। সমঝোতা শুরু হওয়ার পর থেকে মাত্র কয়েকজন রোগী গাজার বাইরে যেতে পেরেছেন।
সহায়তা সংস্থাগুলোর জানিয়েছে, যুদ্ধের সময় গাজায় প্রায় কোনো প্রস্থেটিক সরবরাহ প্রবেশ করতে দেয়নি ইসরায়েল। সম্প্রতি ডব্লিউএইচও নিশ্চিত করেছে, প্রায় দুই বছর পর প্রথমবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৃত্রিম অঙ্গপ্রতঙ্গ তৈরির উপকরণ গাজায় প্রবেশ করেছে।
বর্তমানে গাজায় মাত্র আটজন প্রশিক্ষিত প্রস্থেটিক বিশেষজ্ঞ আছেন এবং দুটি কেন্দ্র কোনোরকম কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গাজা সিটির একটি কেন্দ্রে যুদ্ধের শুরু থেকে প্রায় ২৫০ জনকে কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেয়া সম্ভব হয়েছে, তবে মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
গাজা সিটির ‘আর্টিফিশিয়াল লিম্বস ও পোলিও সেন্টার’ যুদ্ধকালীন সময়ে প্রায় ২৫০ জন রোগীকে কৃত্রিম পা দিয়েছে, তবে মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
২৩ বছর বয়সী ইয়াসিন মারুফ এখন একটি তাঁবুতে দিন কাটাচ্ছেন। তার একটি পা কাটা হয়েছে, অপরটিও গুরুতর আহত হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, উন্নত চিকিৎসা না পেলে দ্বিতীয় পা টিও কেটে ফেলতে হতে পারে।
অনেক তরুণের পড়াশোনা, কাজ ও স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল-নাগগার বলেন, আমি আবার হাঁটতে চাই, পড়াশোনা শেষ করতে চাই এবং অন্যদের মতো স্বাভাবিক জীবন চাই।
সহায়তা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, দ্রুত চিকিৎসা ও নিয়মিত সহায়তা না মিললে গাজার পঙ্গু মানুষেরা দীর্ঘদিন কষ্ট, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার চক্রের মধ্যেই আটকে থাকবেন।