দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় আঘাত হেনেছে শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্প। স্মরণকালের ভয়াবহ এ দুর্যোগে রাজধানী কারাকাসসহ আশপাশের এলাকাগুলো লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ধসে পড়া অগণিত ভবনের নিচে এখনো আটকে আছেন বহু মানুষ। গৃহহীন হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার নাগরিক। খবর রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা- ইউএসজিএস জানিয়েছে, প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে কারাকাস থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে, যার মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২। এর এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে একই অঞ্চলে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি শক্তিশালী ভূকম্পন অনুভূত হয়, যা ১৯০০ সালের পর দেশটিতে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্লোস আলভারাডো জানিয়েছেন, হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোয় এ পর্যন্ত ২৩৫টি মরদেহ আনা হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।
বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক সংকটে দেশটির অবকাঠামো খাত এমনিতেই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে ভয়াবহ এ প্রাকৃতিক বিপর্যয় উদ্ধার তৎপরতাকে চরম সংকটে ফেলেছে। তার ওপর জোড়া ভূমিকম্পের পর দফায় দফায় আফটারশকের কারণে রাজধানী ও উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাহত হচ্ছে উদ্ধার কাজ।
ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, প্রাথমিক হিসাবে অন্তত ২৫০টি ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে অন্তত ২০০ মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর মধ্যে অন্তত আটটি বড় হাসপাতাল, ভেনেজুয়েলান রেড ক্রসের সদর দফতর এবং ফরাসি দূতাবাস রয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উপকূলীয় লা গুয়াইরা রাজ্যের প্রায় ৭০ হাজার পরিবার এ দুর্যোগে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ লা গুয়াইরা অঞ্চলকে ‘দুর্যোগপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি জানান, উদ্ধার অভিযান গতিশীল করতে বেসরকারি খাতের সহায়তায় ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। ভূমিকম্পে কারাকাস বিমানবন্দরের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। উদ্ধারকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবীরা রাতভর ধসে পড়া ভবনগুলোয় অভিযান চালিয়েছেন। তবে কিছু এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি সাহায্য পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে।
লা গুয়াইরা শহরের বাসিন্দা ইয়ামিলেথ জিমেনেজ জানান, তাদের সাত তলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটি ধসে পড়েছে এবং তার ১৯ বছর বয়সী ছেলে এখনও সেটির ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছে। তিনদিন আগেই জিমেনেজের বাবা মারা গেছেন।
জিমেনেজ বলেন, সে কংক্রিটের স্ল্যাবের নিচে চাপা পড়ে আছে, আর তাকে বের করার মতো কোনো যন্ত্রপাতি এখানে নেই।
লা গুয়াইরা শহরে নিখোঁজ আত্মীয়দের খবরের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর সামনেই স্বেচ্ছাসেবীরা খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছিলেন। কারাকাস-লা গুয়াইরার মহাসড়কে সাধারণ নাগরিকদের পানি, খাবার ও জরুরি ওষুধ নিয়ে যেতে দেখা গেছে। প্রাথমিক উদ্ধার তৎপরতা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় সাধারণ মানুষ নিজেরাই এগিয়ে এসেছেন।
৪৬ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ
ইউএসজিএসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে, এমনকি তা ১০ হাজার পেরোনোরও আশঙ্কা রয়েছে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানের চালু করা একটি ওয়েবসাইটে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার কিছু পরে ৪৬ হাজারেরও বেশি মানুষের নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে স্বাধীনভাবে এ তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
আন্তর্জাতিক সহায়তা
দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে দীর্ঘকাল ধরে বিচ্ছিন্ন রয়েছে ভেনেজুয়েলা। তবে এই মানবিক সংকটে ভূরাজনৈতিক বৈরিতা ভুলে সহায়তার হাত বাড়িয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলাকে সব ধরনের লজিস্টিক ও উদ্ধার সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। ওয়াশিংটন ইতিমধ্যেই দেশটির ওপর থাকা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে, যাতে ত্রাণ তহবিলের লেনদেন বাধাগ্রস্ত না হয়। এছাড়া রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা জরুরি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
জাতিসংঘের ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোর সমন্বয় করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভূমিকম্পের আগের অর্থনৈতিক সংকটের কারণেই যেখানে দেশের ৮০ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল, সেখানে এই বিপর্যয় সামাল দিতে একটি ‘বিশাল সম্মিলিত আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা’ প্রয়োজন হবে।
এদিকে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করতে স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা ‘স্টারলিংক’ ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে ২৫ জুলাই পর্যন্ত বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে দেশটির অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত তেল খাতে এ ভূমিকম্পে বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। বিদেশি জ্বালানি কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, তেল ক্ষেত্রের অবকাঠামো নিরাপদ রয়েছে এবং উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।