মিয়ানমারের সাবেক সেনাপ্রধান মিন অং লাইং ‘প্রত্যাশিতভাবে’ই সংসদীয় ভোটে দেশটির প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধের ‘সূচনাকারী’ হিসেবে পরিচিত এ জেনারেল পাঁচ বছর আগে নির্বাচিত সরকার উৎখাত করেন। প্রেসিডেন্ট পদ তার রাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিল। খবর রয়টার্স।
৬৯ বছর বয়সী মিন অং লাইং ২০২১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত অং সান সু চির সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করেন এবং তাকে গ্রেফতার করেন, যা ব্যাপক বিক্ষোভের সৃস্টি করে। ওই বিক্ষোভ পরে পুরো দেশব্যাপী সেনা জান্তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নেয়।
সংসদে বিজয়ী দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) এবং সেনাবাহিনী দ্বারা মনোনীত সশস্ত্র বাহিনী সদস্যরা সাবেক সেনাপ্রধান মিন অং লাইংয়ের অনুগত। তাই আজ দুপুরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রয়োজনীয় ভোট সীমা সহজেই তার পক্ষে যায়।
প্রেসিডেন্ট পদে বসার জন্য সম্প্রতি মিন অং লাইং সেনাপ্রধানের পদ ছাড়েন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু নামমাত্র বেসামরিক রূপান্তর। নতুন সংসদ ও সরকারের অধিকাংশ সদস্যই অনুগত হওয়ায় ক্ষমতার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই থাকছে।
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা নেন মিন অং লাইং। ওই সময় এক বছরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করে বেসামরিক শাসনে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। তবে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সময় লেগেছে পাঁচ বছর।
মিয়ারমানের সাম্প্রতিক নির্বাচনে সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত এক-চতুর্থাংশ আসনের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর সমর্থিত দল ইউএসডিপি বাকি আসনের প্রায় ৮০ শতাংশ জয় করে। ফলে নির্বাচনটি ‘কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন’ ছিল বলে অভিমত বিশ্লেষকদের।
নতুন সরকারেও সামরিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর নতুন প্রধান হিসেবে মিন অং লাইং-এর ঘনিষ্ঠ মিত্র জেনারেল ইয়ে উইন উ দায়িত্ব নেবেন।
এছাড়া একটি নতুন পরামর্শদাতা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এ পরিষদের কাছে থাকবে বেসামরিক ও সামরিক উভয় বিষয়ে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব।
মিন অং লাইং। ছবি: রয়টার্স
২০২০ সালের নির্বাচনে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন দল নিরঙ্কুশ বিজয় পাওয়ার পর অভ্যুত্থান ঘটানো হলে দেশজুড়ে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেই বিক্ষোভ দমন করতে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।
গত পাঁচ বছরে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। জাতিসংঘের হিসেবে, বর্তমানে ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।
সামরিক বাহিনী দেশের বড় অংশে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বিমান হামলা ও ‘পোড়ামাটি’ কৌশল প্রয়োগ করছে। এসব হামলায় স্কুল, হাসপাতাল ও বসতবাড়ি কিছুই বাদ পড়ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, মিন অং লাইং রাষ্ট্রপতি হলেও সংঘাতের চিত্র বদলাবে না। নতুন সেনাপ্রধান তারই নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো মিয়ানমারের প্রায় ৯০টি শহরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
অভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট নতুন সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। সামরিক বাহিনীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে ফেডারেল সংবিধান প্রণয়নের দাবিতে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা।
সামরিক শাসনের ফলে মিয়ানমারের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট। আমদানিনির্ভর জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় পেট্রল ও ডিজেলের রেশনিং চালু হয়েছে, যা ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের জীবনকে আরো কঠিন করে তুলেছে।
এ অচলাবস্থার মধ্যে কিছু রাজনৈতিক মহল সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অং সান সু চি-কে মুক্তি দিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতার পথ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। তবে সামরিক নেতৃত্ব সেই পথে হাঁটতে আগ্রহী, এমন কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।