নেপালে ভয়াবহ বন্যার প্রায় এক সপ্তাহ পর দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় পৌঁছাতে শুরু করেছে উদ্ধারকারী দল। অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করে দুর্গম অঞ্চলে যাওয়ার পাশাপাশি ধ্বংস হয়ে যাওয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে জোর দেয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত দেশটির বিভিন্ন এলাকা থেকে ১১ হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, বন্যায় অন্তত ৯৩৯ জন নিহত হয়েছেন। ঘরবাড়ি, স্বজন ও সম্পদ হারিয়েছেন বহু মানুষ। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন বালেন্দ্র। ৫৯২ বিদেশী নাগরিকসহ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৩ হাজার ৯২৫ জন।
উদ্ধার তৎপরতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে নেপালের পার্বত্য অঞ্চলের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো। কর্তৃপক্ষের ধারণা, এসব প্রকল্পে প্রায় এক হাজার মানুষ আটকা পড়েছিল। এখন পর্যন্ত ২৭৯ শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে কয়েকটি ধ্বংসপ্রাপ্ত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে এখনো প্রায় ৬০০ মানুষ আটকা রয়েছে।
এদিকে দিনের পাশাপাশি রাতেও মাটি ও পাথর সরিয়ে আটকে পড়াদের সন্ধান চালাচ্ছে উদ্ধারকারী দলগুলো। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে খনন করা হচ্ছে ধ্বংসস্তূপ। কোথাও কোথাও সেনাসদস্যরা টর্চের আলোয় ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ খুঁজে দেখছেন।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার একটি নুওয়াকোটে সড়ক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। এতে দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়া সহজ হয়েছে। ওই জেলার বেত্রাবতী গ্রামে একটি বাড়ি থেকে ২৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তা বিপিন রেগমি। তিনি বলেন, উদ্ধারকারী দল নতুন নতুন এলাকায় পৌঁছে মরদেহ উদ্ধারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামোও ধীরে ধীরে সচল হচ্ছে। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। দুর্গম এলাকাগুলোয় পৌঁছাতে প্রতিবেশী ভারত ও চীন সহায়তা করছে বলেও জানিয়েছে নেপাল কর্তৃপক্ষ। তারা অস্থায়ী বেইলি সেতু নির্মাণসহ বিভিন্ন উদ্ধার কার্যক্রমে সহযোগিতা দিচ্ছে।
নেপালের এ ভয়াবহ দুর্যোগের পেছনে হিমালয় অঞ্চলের জলবায়ু ঝুঁকি নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি হিমবাহ ধসে বরফ, পাথর ও কাদার প্রবল স্রোত সৃষ্টি হয়, যা চীন সীমান্তবর্তী নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরার সময় এসেছে এখন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমও জানিয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে হিমবাহের অস্থিতিশীলতার কারণে গত সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি এখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, যোগাযোগ অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুরোপুরি সচল করাই নেপাল সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্যোগের পর নেপালে ৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের বেশি সহায়তা পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। আরো আন্তর্জাতিক সহায়তা আসবে বলে আশা করছেন তারা।