বিক্ষোভ ঠেকাতে কৌশল

মুম্বাই পুলিশের বিরুদ্ধে নজরদারি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ

পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেয়া হলেও অনেকেই অভিযোগ করেছেন, পরবর্তী বিক্ষোভে অংশ না নিতে বিভিন্নভাবে চাপ দেয়া হয়েছে। কেউ হোয়াটসঅ্যাপে নোটিশ পেয়েছেন, কেউ স্থানীয় থানায় হাজিরার নির্দেশ পেয়েছেন, আবার অনেককে লাইভ জিপিএস লোকেশন শেয়ার করতে বলা হয়েছে

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (নিট-ইউজি) নিয়ে ছাত্র আন্দোলন চলছে ভারতের দিল্লিতে। চলমান এ কর্মসূচির আঁচ লেগেছে দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে। এরই মধ্যে মুম্বাই পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, দিল্লির আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে মুম্বাইয়ে আয়োজিত বিক্ষোভে অংশ নিতে যাওয়া শিক্ষার্থী ও তরুণদের নজরদারি, আটক এবং ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। স্ক্রল ডট ইনের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

আন্দোলনকারীদের দাবি, পুলিশ তাদের বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর আগেই আটক করছে, থানায় ডেকে পাঠাচ্ছে, হোয়াটসঅ্যাপে আইনি নোটিশ পাঠাচ্ছে— এমনকি লাইভ জিপিএস অবস্থান শেয়ার করতেও চাপ দিচ্ছে।

গত ২০ জুলাই দিল্লিতে সংসদ অভিমুখে ছাত্রদের মিছিলে পুলিশের লাঠিপেটার ঘটনার পর মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে সংহতি জানাতে যান সদ্য এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থী প্রীতি কাম্বলে। তার এক বন্ধু নিট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সে কারণেই তিনি প্রতিবাদে যোগ দিতে চেয়েছিলেন।

প্রীতি বলেন, ‘আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু নিট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার বাবা-মা মেয়ের পড়াশোনার জন্য সব সঞ্চয় ব্যয় করেছেন। তাই অন্য শিক্ষার্থীদের মতো তারও যেন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সেই দায়বোধ থেকেই আমি প্রতিবাদে যেতে চেয়েছিলাম।’

তবে বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর আগেই প্রীতিকে আটক করে কালাচৌকি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তার নাম, ফোন নম্বর ও ঠিকানা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হলেও সেখানেই বিষয়টি শেষ হয়নি। পরদিন স্থানীয় আম্বোলি থানায় গিয়ে মহারাষ্ট্র পুলিশ আইন এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) বিভিন্ন ধারায় জারি করা নোটিশ সংগ্রহ করতে বলা হয়। এরপর আবার পুলিশ সদস্যরা তার বাড়িতেও যান এবং থানায় যেতে চাপ দেন। প্রীতির ভাষ্য, ‘মা বাধা না দিলে পুলিশ আমাকে জোর করেই নিয়ে যেত।’

এ ধরনের অভিজ্ঞতা শুধু প্রীতির নয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৬ জুলাই থেকে বিভিন্ন বিক্ষোভে অংশ নেয়ার অভিযোগে মুম্বাইয়ে ১ হাজার ৪০০ জনকে পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে বলে বুধবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে মুম্বাই পুলিশ।

পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেয়া হলেও অনেকেই অভিযোগ করেছেন, পরবর্তী বিক্ষোভে অংশ না নিতে বিভিন্নভাবে চাপ দেয়া হয়েছে। কেউ হোয়াটসঅ্যাপে নোটিশ পেয়েছেন, কেউ স্থানীয় থানায় হাজিরার নির্দেশ পেয়েছেন, আবার অনেককে লাইভ জিপিএস লোকেশন শেয়ার করতে বলা হয়েছে।

লেখক রোহান শেলার জানান, ১৯ জুলাই দাদারের একটি মৌন মিছিলে অংশ নিতে গিয়ে তিনি আটক হন। তার অভিযোগ, ‘পুলিশ আমার চুল টেনেছে, জামাকাপড় ধরে টেনেছে।’ মুক্তি পাওয়ার পরও তিনি স্থানীয় থানার কাছ থেকে বারবার ফোন পেয়েছেন এবং তার বাড়ির বাইরে পুলিশ সদস্যদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলেও দাবি করেন।

আরেক শিক্ষার্থী নন্দিনী গৌতম বলেন, তিনি প্রতিবাদে যোগ দেয়ার আগেই আটক হন। পরে স্থানীয় থানার এক কর্মকর্তা তাকে ফোন করে বাড়িতে থাকতে এবং লাইভ লোকেশন পাঠাতে বলেন। তার দাবি, ‘শেষ পর্যন্ত তিনি আমাকে হুমকি দিয়ে বলেন, তারা আমার ঠিকানা জানেন এবং যেকোনো সময় আমাকে তুলে নিতে পারেন।’

৩৬ বছর বয়সী আন্দোলনকারী অন্নপূর্ণা সোনিকেও ২০ জুলাই আটক করা হয়। পরে গভীর রাতে হোয়াটসঅ্যাপে নোটিশ পাঠানো হয় এবং আবার থানায় হাজির হতে বলা হয়। পরে এক পুলিশ কর্মকর্তা ফোনে তাকে জানান, ‘ওপর থেকে নির্দেশ এসেছে, আপনাকে আবার থানায় আসতে হবে।’ সোনির অভিযোগ, এগুলো আমাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা। কিন্তু এতে আমরা থেমে যাব না।

এদিকে পুলিশের এমন পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন মানবাধিকার আইনজীবী ও অধিকারকর্মীরা। মানবাধিকার আইনজীবী লারা জেসানি বলেন, ‘তরুণ শিক্ষার্থীদের ভয় দেখানোর জন্যই এসব কৌশল নেয়া হচ্ছে। আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না দিয়ে কাউকে আটক করা বা পরোয়ানা ছাড়া বাড়ি থেকে তুলে নেয়া আইনসম্মত নয়।’

আইনি সহায়তা চাওয়া অনেক আন্দোলনকারী আতঙ্কিত হয়ে ফোন করেছেন বলে জানান আইনজীবী সামিয়া কোরদে। কারণ পুলিশ তাদের সার্বক্ষণিক জিপিএস অবস্থান জানাতে বলছে। তার মতে, এর উদ্দেশ্য আন্দোলনকারীদের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করা এবং বিক্ষোভে অংশ নেয়া নিরুৎসাহিত করা।

তবে পুলিশের অবস্থান ভিন্ন। মুম্বাই পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রতিবাদ করা মানুষের অধিকার, তবে তা অন্যের অধিকার ব্যাহত করতে পারে না। নিষেধাজ্ঞা জারি থাকলে আমরা তাদের বাইরে না যেতে বলতে পারি, এমনকি অবস্থানও জানতে চাইতে পারি।’

পুলিশের দাবি, ১৬, ২০ ও ২১ জুলাইয়ের বিক্ষোভগুলোর জন্য পূর্বানুমতি নেয়া হয়নি।

গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাপ ও নজরদারির মধ্যেও অনেক শিক্ষার্থী আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির শিক্ষার্থী অনুষ্কা কাশিবাসি বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহি থাকতে হবে। সরকারকে জবাব দিতে হবে।’

সাঞ্চি ভোয়ার একাদশ শ্রেণিতে পড়েন এবং নিট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু একটি ভালো শিক্ষাব্যবস্থা চাই। তাহলে পুলিশ আমাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে?’

আরও