৩০ বছর বয়সী পার্ক সেউং-হোয়ান (ছদ্ম নাম) জন্মগতভাবে উত্তর কোরিয়ার নাগরিক। তবে কিম সরকারের দমন পীড়ন থেকে বাঁচতে ২০১২ সালে পালিয়ে সিউলে যান তিনি। এখন দেশে তিনি অপরাধী, নিষিদ্ধ। আর তাই নিজের বাড়ি বলতে তার কাছে গুগল আর্থের দেখানো ছায়া।
গুগল আর্থ খুলে যখন পার্ক সেউং-হোয়ান নিজের বাড়িটি খুঁজে পান, স্ক্রিনে হাত বুলিয়ে স্পর্শ করেন নিজের ঘর আর পরিবারকে। তিনি দেখেন ছাদের মেরামত শেষ হয়েছে, ফসলও ফলছে—তার পাঠানো অর্থ পরিবারের হাতে পৌঁছানোর এটাই প্রমাণ। অর্থ পাঠানোই পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ রাখার সহজ ও একমাত্র উপায়।
২০১২ সালে সিউলে যাওয়ার পর প্রতি কিস্তিতে দুই থেকে তিন মিলিয়ন ওন পাঠাতেন, যা দিয়ে তার পরিবার এক বছর সাদা ভাত খেতে পারত। উত্তর কোরিয়ায় এটি বিলাসিতার প্রতীক। কিন্তু গত দুই বছর ধরে সে যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন।
গোপন যাত্রাপথ আর বহু ধাপ অতিক্রম করে সিউল থেকে পিয়ংইয়ংয়ে পৌঁছে পার্কের পাঠানো অর্থ। দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা উত্তর কোরীয় শরণার্থীরা টাকা দেন ব্রোকারদের হাতে। ব্রোকাররা এই অর্থ চীনা মুদ্রায় রূপান্তর করে। এরপর মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সীমান্ত পেরিয়ে অর্থ যায় উত্তর কোরিয়ায়। সেখানকার ব্রোকাররা অর্থ তুলে দেন পরিবারের হাতে। যোগাযোগ হয় সীমান্তের কাছাকাছি কার্যকর চীনা ফোনে। অনেক সময় পরিবার ভিডিও পাঠায়—অর্থ হাতে নিয়ে গুনছে। যেন প্রমাণ থাকে টাকা সত্যিই পৌঁছেছে।
মানবাধিকার ডেটাবেস সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে ৪০ শতাংশ উত্তর কোরীয় শরণার্থী অন্তত একবার পরিবারের কাছে অর্থ পাঠিয়েছেন। কিন্তু কমিশন ও ঘুষের কারণে প্রায় ৪০ শতাংশ অর্থ মাঝপথেই হারিয়ে যায়, পরিবারের কাছে পৌঁছে পাঠানো অর্থের মাত্র ৬০ শতাংশ।
সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ভেঙে পড়ছে এ গোপন নেটওয়ার্কটি। ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার পুলিশ হঠাৎই এ নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। প্রথমে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত থাকলেও কোনো গুপ্তচরবৃত্তির প্রমাণ না পেয়ে মামলাগুলো ঘুরে দাঁড়ায় আর্থিক অপরাধে। এরইমধ্যে অন্তত ১০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তিনজন এখনও বিচারাধীন। ফলে নেটওয়ার্কের ৭০ শতাংশ কার্যত ভেঙে গেছে। এই নেটওয়ার্ক আবার গড়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন দলের একজন।
এই সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে প্রতারক চক্র। বিশ্বাসযোগ্য ব্রোকাররা কাজ বন্ধ করে দেয়ায় পার্ক দুই বছর ধরে অর্থ পাঠাতে পারছেন না। এ অবস্থায় কিছু রাজনীতিক এগিয়ে আসছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার বিরোধী দল পিপল পাওয়ার পার্টির সংসদ সদস্য ইহ্ন ইয়ো-হান মানবিক কারণে ক্ষুদ্র অঙ্কের রেমিট্যান্স বৈধ করার প্রস্তাব প্রস্তুত করছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার একীভূতকরণ মন্ত্রণালয়ও স্বীকার করছে এটি কেবল আইন নয়, মানবিকতার প্রশ্নও।
দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে