গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ দাঙ্গার এক সপ্তাহ পর আজ শনিবার ফ্রান্সে আবারো বিক্ষোভের ডাক দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। বিক্ষোভ ঘিরে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খবর বিবিসি।
শিক্ষার্থী, শ্রমিক ইউনিয়ন ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে দ্বিতীয় দফায় এ বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এরই মধ্যে দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গত ১৭ অক্টোবরের সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার ব্যাপকতা আগে থেকে আঁচ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছিল সরকার। তাই এবার নতুন করে যেকোনো সহিংসতা ঠেকাতে দেশজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, কোনো অপরাধকেই বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেয়া হবে না। ভাঙচুরকারী, লুটপাটকারী এবং সহিংসতায় জড়িত সবার বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থানে থাকব। তিনি আরো বলেন, নির্ধারিত বিক্ষোভের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্র বামপন্থী ও কট্টর উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে সহিংসতার বহু আহ্বান দেখা গেছে।
এর আগে শুক্রবার উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। বৈঠক শেষে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তাদের দাবির বিষয়ে মাখোঁ সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করেছেন। তবে একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে মাখোঁ ঘোষণা দেন, শনিবার কেবল স্বীকৃত শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর আয়োজিত বিক্ষোভই অনুমোদন পাবে। এর চেয়েও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে লিওঁ, নিস ও মন্টপেলিয়েসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। এসব শহরে সব ধরনের সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা বিক্ষোভের আয়োজকদের খুব একটা নিরুৎসাহিত করতে পারেনি। ফ্রান্সজুড়ে বড় ও ছোট মিলিয়ে শত শত বিক্ষোভ কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে।
গত এক সপ্তাহে রাজধানী প্যারিসের কিছু এলাকাসহ কয়েকটি শহরে আংশিক কারফিউ জারি ছিল। ফলে শনিবার কোন শহরে কতটা বিক্ষোভের অনুমতি দেয়া হবে, তা নিয়ে দেশজুড়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।
আজকের বিক্ষোভের সম্ভাবনা সামনে রেখে কিছু শহরের মেয়র ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছেন। অন্যদিকে কোথাও কোথাও কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধিত বিক্ষোভের অনুমতি দেয়া হয়েছে। যেমন মার্সেইয়ে সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার আগের আদেশ দ্রুত প্রত্যাহার করে শ্রমিক ইউনিয়নের আয়োজিত মিছিলের অনুমতি দেয়া হয়।
প্যারিসে শিক্ষার্থীদের শ্রমিক ইউনিয়নের আয়োজনে এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সমর্থনে একটি মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে মিছিলটি শহরের কেন্দ্রস্থল দিয়ে যেতে পারবে না। তা সত্ত্বেও শহরের পরিচিত কয়েকটি এলাকায় নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কায় প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।
এদিন লুভর, ওর্সে ও পিকাসো জাদুঘর বন্ধ থাকবে। ফরাসি ফুটবল ক্লাব পিএসজির নির্ধারিত ঘরের মাঠের ম্যাচটি সোমবারে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সম্ভাব্য লুটপাটের আশঙ্কায় কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের দোকানের জানালায় কাঠের পাটাতন লাগিয়েছে।
গত সপ্তাহের সহিংসতার ধাক্কা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ফ্রান্স। ওই দিন বিক্ষোভকারী ও দাঙ্গাকারীদের তুলনায় পুলিশ সদস্যের সংখ্যা অনেক কম ছিল। বিভিন্ন দোকানে লুটপাট এবং ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল লিমোজ শহরের উনিশ শতকে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন টাউন হলে আগুন দেয়ার ঘটনা।
শুক্রবার দেশটির বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ জানান, ১৭ অক্টোবরের দাঙ্গায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২৩২ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া এক হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষ আদালতে হাজির হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২৬০ জনের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
লুটপাট কিংবা পুলিশকে আক্রমণ করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি চেয়ে প্রসিকিউটরদের নির্দেশ দিয়েছেন দারমানাঁ। এসব শাস্তির মধ্যে বিক্ষোভে অংশ নেয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, ভোটাধিকার প্রত্যাহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বাধা দেয়ার বিষয়ও রয়েছে।