দ্য গার্ডিয়ান

আপাতত পান্ডা কূটনীতির ইতি টেনে জাপান থেকে চীনে ফিরছে ‘জায়ান্ট পান্ডা’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় তিন দশক পর ১৯৭২ সালে চীন ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। সেই বছর থেকেই জাপানে জায়ান্ট পান্ডার আগমন শুরু। এরপর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপানের বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় ৩০টির বেশি পান্ডা ধার দিয়েছে চীন

টোকিওর উএনো চিড়িয়াখানার ‘পান্ডা হাউস’ তখনো খোলার সময় হয়নি। তবু সকাল থেকেই ভিড় জমাতে শুরু করেছেন দর্শনার্থীরা। প্রবেশপথের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ ছবি তুলছেন। একটু দূরের গিফট শপে পান্ডা-থিমের খেলনা, স্টেশনারি, টি-শার্ট আর বিস্কুট বিক্রি হচ্ছে হু হু করে।

এই ভিড়ের মূল কারণ—বিদায়। দর্শনার্থীরা বিদায় জানাতে এসেছে উএনো চিড়িয়াখানার দুই জনপ্রিয় জায়ান্ট পান্ডা শাও শাও ও লেই লেইকে। ২০২১ সালে টোকিওতেই জন্ম নেয়া এ যমজ পান্ডা আসলে চীনের কাছ থেকে ধার নেয়া ছিল। আগামী সপ্তাহে তাদের টোকিওর নারিতা বিমানবন্দর থেকে চীনে উড়িয়ে নেয়া হবে। সেখানে কোয়ারেন্টিন শেষে তারা সিচুয়ান প্রদেশের একটি সংরক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রে থাকা তাদের বোন শিয়াং শিয়াংয়ের সঙ্গে পুনর্মিলিত হবে।

এ বিদায় শুধু জাপানের অসংখ্য পান্ডাপ্রেমীর মন খারাপের কারণ নয়; বরং এটি চীন-জাপান সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবনতিরও এক প্রতীকী প্রকাশ।

চীনের জায়ান্ট পান্ডা সাধারণত ১০ বছরের জন্য জাপান বা অন্যান্য দেশের চিড়িয়াখানায় ধার দেয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে যদি কোনও বাচ্চা পান্ডা জন্মায়, তবে সে-জন্য আলাদা চুক্তি হয়। পরে সময়সীমা শেষ হলে মূল চুক্তি অনুযায়ী পান্ডাগুলো আবার চীনে ফিরিয়ে দেয়া হয়

৫৩ বছর পর পান্ডাশূন্য জাপান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় তিন দশক পর ১৯৭২ সালে চীন ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। সেই বছর থেকেই জাপানে জায়ান্ট পান্ডার আগমন শুরু। এরপর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপানের বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় ৩০টির বেশি পান্ডা ধার দিয়েছে চীন। প্রতিবারই পান্ডাদের আগমন যেমন উৎসবের আবহ তৈরি করেছে, তেমনি বিদায় মানেই ছিল আবেগঘন মুহূর্ত। শাও শাও ও লেই লেই ফিরে গেলে ১৯৭২ সালের পর প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণভাবে পান্ডাশূন্য হয়ে পড়বে জাপান।

তাইওয়ান প্রশ্নে ভাঙন

চীন-জাপান সম্পর্কের নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও ‘পান্ডা কূটনীতি’ টিকে ছিল। এমনকি পূর্ব চীন সাগরের সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধও একে থামাতে পারেনি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। তাইওয়ান ইস্যুতে ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দুই দেশের সম্পর্ক।

সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এক বক্তব্যে বলেন, চীন যদি তাইওয়ানে সামরিক আগ্রাসন চালায়, তবে জাপান আত্মরক্ষাবাহিনী মোতায়েন করতে পারে। তিনি একে জাপানের জন্য ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ বলে উল্লেখ করেন। গত নভেম্বরে সংসদীয় কমিটিতে দেয়া এ মন্তব্য চীনকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে টোকিও হস্তক্ষেপ করছে বলে অভিযোগ তোলে বেইজিং।

এরপর থেকেই জাপানে ভ্রমণ সতর্কথা জারি করেছে চীন। ফলে দেশটিতে চীনা পর্যটকের সংখ্যা কমেছে, বাতিল বা স্থগিত হয়েছে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও নানা যৌথ আয়োজন। সে উত্তেজনার আঁচ এবার এসে পড়েছে পান্ডাদের ওপর।

নতুন পান্ডা পাঠাতে নারাজ চীন

টোকিও কর্তৃপক্ষ নতুন পান্ডা পাঠানোর অনুরোধ করলেও চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উএনো চিড়িয়াখানায় নতুন পান্ডা পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পত্রিকা বেইজিং ডেইলি এক বিশেষজ্ঞের বরাতে লিখেছে, জাপান-চীন উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে জাপানে আর পান্ডা দেখা নাও যেতে পারে।

ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপান-চীন সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রুমি আওয়ামা বলেন, জায়ান্ট পান্ডা মূলত চীন-জাপান বন্ধুত্বের প্রতীক। তারা সম্পর্কের চালিকাশক্তি নয়, বরং দুই দেশের সম্পর্কের সামগ্রিক অবস্থার সূচক। অর্থাৎ, পান্ডার উপস্থিতি যেমন সম্পর্ক উন্নয়নের নিশ্চয়তা দেয় না, তেমনি তাদের প্রত্যাবর্তনও সম্পর্ক ভাঙনের একমাত্র কারণ নয়—তবে এটি বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিফলন।

আবেগে ভাসছে পান্ডাপ্রেমীরা

৫০ বছর আগে, চীনের পাঠানো প্রথম পান্ডা কাং কাং ও লান লান দেখতে উএনো চিড়িয়াখানায় ভিড় করেছিলেন ৭৬ লাখেরও বেশি মানুষ। ২০০৮ সালে দীর্ঘদিনের বাসিন্দা পান্ডা লিং লিং মারা গেলে চিড়িয়াখানার কর্মীদের চোখেও জল দেখা গিয়েছিল। এবারও শাও শাও ও লেই লেইয়ের বিদায়ের ঘোষণার পর থেকেই দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায়।

ওয়াশিংটন কনভেনশনের আওতায় হওয়া পান্ডা ধার কর্মসূচি পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি আগামী মাসে আগাম সাধারণ নির্বাচন ডেকেছেন। তাইওয়ান ইস্যুতে তার অবস্থান বদলানোর কোনো ইঙ্গিত নেই।

এমন পরিস্থিতিতে উএনো চিড়িয়াখানার শেষ লটারির দর্শনার্থীরা রোববার আবেগঘন বিদায় জানাবেন শাও শাও ও লেই লেইকে। যাদের টিকিট মেলেনি, তারা লাইফসাইজ পান্ডা মডেলের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। বাঁশ কামড়ানো পান্ডার ছবির নিচে ঝুলছে একটি ব্যানার, তাতে লেখা— ‘ধন্যবাদ, শাও শাও।’

আরও