দুই দিন আগে আকস্মিক বন্যায় বিধ্বস্ত নেপালের বিভিন্ন শহরে ভারি যন্ত্রপাতি নিয়ে কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, জীবিতদের উদ্ধারের আশা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। একইসঙ্গে নতুন করে বন্যার ঝুঁকি কমাতে কাজ করছেন দেশটির কর্মকর্তারা। খবর রয়টার্স।
নেপালে বন্যায় আজ ভোর পর্যন্ত ৩৮৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া নেপাল ও প্রতিবেশী তিব্বতে প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। গত বুধবার সকালে হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ পানি, পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ হিমালয়ের নদীব্যবস্থায় প্রবল স্রোতে নেমে আসার পর এ বিপর্যয় ঘটে।
বন্যার স্রোত গ্রাম ও উপত্যকার ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও সেতু ধ্বংস করে দিয়েছে। কাঠমান্ডু থেকে তিব্বতের লাসা যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকাটি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের কাছে জনপ্রিয়। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশী।
নেপালের কর্তৃপক্ষ হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নিখোঁজদের সন্ধান চালাচ্ছে এবং দুর্গম শহর ও উপত্যকায় আটকে পড়া হাজার হাজার মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে। জরুরি পরিষেবা কর্মীরা কোথাও কোথাও প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করে বন্যার পানিতে ভেসে আসা মরদেহ উদ্ধার করেছেন।
নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহর রাসুয়া থেকে গতকাল উদ্ধার হওয়া শেষদিকের কয়েকজনের একজন ছিলেন দিবগা তামাং। আরো তিনজনের সঙ্গে তাকে হেলিকপ্টারে করে নুওয়াকোটের একটি সেনা ক্যাম্পে নেয়া হয়।
তামাং বলেন, ‘আমাদের সবাই ভেসে গেছে। তারা মারা গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করার মতো আর কেউ নেই। সবকিছু, সবাই শেষ হয়ে গেছে।’
বন্যার পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় এখন আরো একটি বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যার এলাকায় ধ্বংসাবশেষ জমে ভোতেকোশি নদীর প্রবাহ আটকে একটি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। হ্রদটির পানির উচ্চতা বাড়ছে এবং যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে পানি বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, সীমান্তের ওপারে চীন জানিয়েছে, এরই মধ্যে বাঁধে আটকে থাকা একটি হ্রদে আগামী তিন দিনে প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি প্রবেশ করতে পারে। এই পরিমাণ পানি প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুলের সমান।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হ্রদের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। পানির প্রবাহের সর্বোচ্চ মাত্রা আগামী ১ সেপ্টেম্বরের দিকে দেখা যেতে পারে বলে জানিয়েছে দেশটির পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়।
সীমান্ত দিয়ে বয়ে যায় ভয়াবহ স্রোত
গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত চীনা উদ্ধারকারীরা সীমান্তের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা গিরং সীমান্ত ক্রসিংয়ে পৌঁছাতে পারেননি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলাকাটিতে যাওয়ার প্রধান সড়ক থেকে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চলছিল।
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড নেটওয়ার্কে গিরং সীমান্তবন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গত এক দশকে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে সেখানে লজিস্টিকস এলাকা ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সীমান্ত ক্রসিং এলাকার বিভিন্ন স্থাপনার ওপর দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে প্রবল কাদামিশ্রিত পানি ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। পালানোর চেষ্টা করা লোকজনও ওই স্রোতে ভেসে যায়।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশী নাগরিক। এখন পর্যন্ত চীনের অংশে মাত্র তিনজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
চীনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর কর্মকর্তা ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং বৃহস্পতিবার বিকালে দুর্যোগকবলিত গিরং এলাকা পরিদর্শন করেন। তার এই সফর থেকে বোঝা যায়, বেইজিং এ দুর্যোগকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
গতকাল বন্যাকবলিত নুওয়াকোট পরিদর্শন করেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। তিনি বলেন, পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
শাহ বলেন, ‘রাষ্ট্রের সব সংস্থা পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে। এখন আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো প্রতিটি নাগরিকের জীবন রক্ষা, নিখোঁজদের সন্ধান ও উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে তাৎক্ষণিক সহায়তা দেয়া।’
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হয়ে আসা পাঁচ মাস বয়সী শাহ সরকারের জন্য এ দুর্যোগ বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কর্মকর্তারা বলেছেন, নেপালের এমন বিপর্যয় মোকাবিলার অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও দক্ষ কর্মকর্তারাও রয়েছেন। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পেও দেশটিতে প্রায় ৯ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল।