সিএনএনের এক্সপ্লেনার

সৌদি আরবের ৮৩ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যয়ও ঠেকাতে পারছে না হুথিদের হামলা

গত বছর প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে ছিল সৌদি আরব। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ও থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন উন্নত অস্ত্র সংগ্রহ করেছে। তবে দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড ও বিভিন্ন দিক থেকে আসা হুমকির কারণে এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ছে।

প্রতিরক্ষা খাতে বছরে ৮৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পুরোপুরি ঠেকাতে পারছে না সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং একাধিক স্তরের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দেশটির বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার ও পাইপলাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঝুঁকিতে রয়েছে। সৌদি আরবের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি পরিস্থিতি দেশটির বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও পর্যটন খাতের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার জন্যও উদ্বেগ তৈরি করছে।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে ছিল সৌদি আরব। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ও থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন উন্নত অস্ত্র সংগ্রহ করেছে। তবে দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড ও বিভিন্ন দিক থেকে আসা হুমকির কারণে এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ছে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের সংঘাতের সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে ইরান সৌদি আরবের লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। উত্তরে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। দক্ষিণে ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে ইরান-সমর্থিত হুথিরা। ফলে রাজধানী রিয়াদ কিংবা কোনো একটি তেল স্থাপনা নয়, বরং দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিপুলসংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে সৌদি কর্তৃপক্ষকে।

হুথিরা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর একযোগে চাপ সৃষ্টি করছে। নিচু দিয়ে উড়ে আসা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও অনুসরণ করা তুলনামূলক কঠিন। এছাড়া হুথিরা কৌশল পরিবর্তন করতে সক্ষম নতুন প্রজন্মের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করেছে। সৌদি আরব অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে পারলেও কিছু হামলা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে।

হুথিদের সামরিক সক্ষমতার পেছনে ইরানের সহায়তার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা অতীতে ইয়েমেনে ইরানি উৎসের ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ, সামরিক সরঞ্জাম ও চালকবিহীন আকাশযানের উপস্থিতি শনাক্ত করেছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের ব্যবহৃত হাথেম-২ ও প্যালেস্টাইন-২ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশার সঙ্গে ইরানি অস্ত্রের মিল রয়েছে। তবে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য রয়েছে।

২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সাত বছর ধরে সংঘাত চলে। এরপরও ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে অর্থনৈতিক ও পরিবহন অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। গত জুলাইয়ে হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজে হামলার ঘোষণা দেয়। এরপর দেশটির তেল শোধনাগার ও বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়। সৌদি বিমান হামলা বন্ধ এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে কয়েক বিলিয়ন ডলার দেয়ার দাবি জানিয়েছে গোষ্ঠীটি।

সৌদি আরবের সামনে এখন সংঘাত কমানো ও সামরিক অভিযান জোরদার করার মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। হুথিদের হামলায় বিমানবন্দরে এক ডজনের বেশি বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর পর তাদের সঙ্গে সমঝোতা করা সৌদি কর্তৃপক্ষের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে, বিমান হামলা আরো বাড়ালে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি বাড়বে। এতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও পর্যটনের আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবকে গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

দেশটির সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ গত সপ্তাহে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়ে মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা দেয়া বন্ধ করেছিল। রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর সতর্কবার্তা আবার চালু করা হয়েছে বলে কয়েকজন বাসিন্দা সিএনএনকে জানিয়েছেন। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, সোমবার তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। তবে হামলার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নীরবতা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।

হুথিদের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান চালিয়ে সামরিকভাবে পরাজিত করাও সহজ নয়। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর জন্য লড়াই করা কঠিন হয়ে উঠেছে পাহাড়ি ভূখণ্ডে হুথিদের অবস্থান এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে। যুক্তরাষ্ট্র গত বছর সাত সপ্তাহের বিমান০ হামলা অভিযানে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেও হুথিদের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি। গোষ্ঠীটি এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ শহর তাইজকে ঘিরে ফেলেছে বলে ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার জানিয়েছে।

এদিকে হুথিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে সৌদি আরব। আঞ্চলিক মিত্ররা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। পাকিস্তান সৌদি আরবকে রক্ষায় কয়েক হাজার সেনা পাঠিয়েছে এবং মিসর প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্রভাণ্ডারেও ঘাটতি রয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগের এক প্রতিবেদনে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের কারণে গোলাবারুদের মজুদে ঘাটতি ও সরবরাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে উৎপাদনগত বাধার কথা বলা হয়েছে।

হুথিদের হামলার ঝুঁকি শুধু তেল খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির ডেটা সেন্টার, লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ও বিমানবন্দর প্রযুক্তি, পানি সরবরাহ এবং পর্যটন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে চলমান সংঘাতের প্রভাব সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনার ওপরও পড়তে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশটির জন্য সামরিক প্রতিরক্ষা জোরদারের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আরও