ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের যে হুমকি দিয়েছে, তার নিন্দা জানিয়েছে চীন। বেইজিং বলেছে, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা অবৈধ। একইসঙ্গে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ‘সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটি। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখা যেকোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার হুমকি প্রত্যাখ্যান করবে—চীনের এমন অবস্থান আগে থেকেই অনুমান করা হচ্ছিল। ইরানের জ্বালানি তেল রফতানির অন্তত ৮০ শতাংশ যায় চীনে। তেহরান সরকারের রাজস্ব প্রবাহ সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের আগের বিভিন্ন প্রচেষ্টাও উপেক্ষা করেছে বেইজিং।
চীনের এই অবস্থান থেকে প্রশ্ন উঠেছে, ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টায় ট্রাম্প প্রশাসন চীন ও দেশটির আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা সংঘাতে যেতে প্রস্তুত।
গত সোমবার নিষেধাজ্ঞার সুনির্দিষ্ট কিছু ঘোষণা দেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। এসময় ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগে ৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন। তবে ইরানের জ্বালানি তেল বাণিজ্যে অর্থায়নে জড়িত থাকা সত্ত্বেও তালিকায় কোনো চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। বিষয়টি ইঙ্গিত করে, চীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন কেন তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেনি এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুগুলোর নামও প্রকাশ করেনি—এমন প্রশ্নের জবাবে বেসেন্ট বলেন, ‘আমি কেন বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চাইব?’
অর্থ ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নির্ধারিত বৈঠকের আগে চীনের পাল্টা পদক্ষেপের ঝুঁকি সম্পর্কে প্রশাসন ভালোভাবেই অবগত। চীন আর্থিক বাজারের মাধ্যমে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে অথবা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রফতানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘চীন ও ইরানের সহযোগিতা সব সময় আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়েছে এবং এতে হস্তক্ষেপ বা বিঘ্ন ঘটানো উচিত নয়।’
তিনি বলেন, ‘চীন অনেকবার জানিয়েছে যে অবৈধ একতরফা নিষেধাজ্ঞার দৃঢ় বিরোধিতা করে। নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ দৃঢ়ভাবে রক্ষায় চীন সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’
যুদ্ধ ও এর সঙ্গে যুক্ত মার্কিন অবরোধে ইরানের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বেসেন্টের হুমকির জবাবে তেহরান তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি।
ইরানের অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ‘আমাদের প্রতিরক্ষা এখন আর শুধু প্রতিরক্ষামূলক নয়; শত্রুদের আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করা উচিত।’
এদিকে মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালির মুখে একটি তেলবাহী ট্যাংকার অজ্ঞাত একটি বস্তু বা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার জানিয়েছে, জাহাজটির ক্রুরা নিরাপদে আছেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। সোমবার সরু এ জলপথ দিয়ে মাত্র দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ সফলভাবে চলাচল করতে পেরেছিল বলে জানা গেছে।
হরমুজ প্রণালির যৌথ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গতকাল ইরান ও ওমান আলোচনা করেছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি আলোচনার পর বলেন, শিগগিরই প্রণালিটি দিয়ে সাময়িকভাবে চলাচলের জন্য একটি স্বীকৃত রুট ঘোষণা করা হতে পারে বলে তারা আশাবাদী।
এদিকে পাকিস্তানের একটি প্রতিনিধিদলও তেহরানে ছিল। এক দিনের আলোচনা শেষে গতকাল তারা ইরান ত্যাগ করে। সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বাধীন ওই প্রতিনিধিদল ইরান সংঘাত নিরসনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তেহরানের আলোচনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
বেসেন্টের ভাষায় ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে উল্লেখিত এ নিষেধাজ্ঞা অভিযান ঘোষণা থেকে বোঝা যাচ্ছে, ইরান সংঘাতের সমাধানের সম্ভাবনা এখনো অনেক দূরে। একইসঙ্গে ছয় মাসের যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিতভাবে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে না পারার পর যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তির বদলে অর্থনৈতিক পদক্ষেপের দিকে বেশি ঝুঁকছে বলেও ইঙ্গিত মিলছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অবশ্য বলেছেন, আরো সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার সম্ভাবনা বাতিল করা হয়নি। সোমবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি বা ইরানের আশপাশে ‘কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালানোর বিষয় আমরা কোনোভাবেই বাদ দিচ্ছি না।’
বেসেন্ট নিষেধাজ্ঞা অভিযানকে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া নরম্যান্ডি অবতরণের সঙ্গে এর তুলনা করেন।
তিনি বলেন, ‘আজ সেই একই চেতনায় আমরা বিশ্বজুড়ে ইরানের আর্থিক যোগাযোগের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক আক্রমণ শুরু করছি।’ তার ভাষায়, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো এই স্বৈরাচারী সরকারকে টিকিয়ে রাখা প্রতিটি অর্থনৈতিক পথ বিচ্ছিন্ন করা, যতক্ষণ না তেহরান একা হয়ে পড়ে।’
স্কট বেসেন্ট বলেন, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে তারা শনাক্ত করেছে। প্রত্যেক লঙ্ঘনকারীকে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য সময়সীমা দেওয়া হবে। ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘ইরানের পক্ষে অর্থ পাচারে সহায়তা করে এমন যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে মার্কিন ডলারভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। সময় গণনা এখনই শুরু হয়েছে।’
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ অনাবাসিক ফেলো সিনা তুসি বলেন, প্রায় ছয় মাস ধরে সামরিক বা কূটনৈতিক কোনো বিজয় না পাওয়ার পর ওয়াশিংটন এখন সামরিক শক্তি যে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, তা তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে অর্জনের চেষ্টা করছে। তবে তেহরানও একই ধরনের ‘জিরো-সাম’ বা এক পক্ষের লাভ মানেই অন্য পক্ষের ক্ষতি—এমন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জবাব দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতও মার্কিন পদক্ষেপের আগাম আঁচ পেয়ে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের আরেক বাণিজ্যিক অংশীদার তুরস্ক অবশ্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানের সমালোচনা করলেও নিষেধাজ্ঞার হুমকির বিষয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেসের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যান্ড্রু মিলার বলেন, ইরান ও দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—এই যুদ্ধ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নির্মূল বা দেশটির সরকারকে দুর্বল করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো অগ্রগতি এনে দিতে পারেনি।
তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে দ্রুত কোনো সমঝোতা এনে দেবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।