ইউক্রেনে এআইচালিত রুশ ড্রোনের হামলায় নিহত ৩

বিশেষজ্ঞ ও সামরিক কর্মকর্তারা জানান, মানব অপারেটররা ড্রোনটিকে নির্দিষ্ট একটি গ্যাস স্টেশনের দিকে যাওয়ার জন্য প্রোগ্রাম করেছিলেন। তবে কাছাকাছি পৌঁছানোর পর ড্রোনটি নিজেই তার নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্বাচন করে। সম্ভবত লক্ষ্য ছিল গ্যাস স্টেশনের প্রোপেন গ্যাসের ট্যাংক। এসব ট্যাংক শনাক্ত ও আঘাত করার জন্য ড্রোনটির এআইকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল।

প্রাণ বাঁচাতে দৌড়েছিলেন তরুণী। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। গত মাসে ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর জাপোরিঝঝিয়ায় মডেল উড়োজাহাজের মতো দেখতে একটি ছোট রুশ ড্রোন আকাশ থেকে নিচে নেমে আসে। একটি গ্যাস স্টেশনের দিকে যাওয়ার সময় ড্রোনটি দেয়ালে আঘাত করে বিস্ফোরিত হয়। ছড়িয়ে পড়া ধাতব টুকরোর আঘাতে ১৯ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তেতিয়ানা বুবিনেতসসহ তিনজন নিহত হন।

রুশ বিমান হামলায় নিহত হাজারো ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিকের মধ্যে ছিলেন তারা। তবে তাদের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন ও উদ্বেগজনক একটি বিষয় সামনে এসেছে। ড্রোনটি কোনো মানব পাইলটের মাধ্যমে নয়, পরীক্ষামূলক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবস্থা দিয়ে পরিচালিত হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ড্রোন বিশেষজ্ঞরা। জাপোরিঝঝিয়ায় চালানো অন্য হামলার ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা শেষে ফরেনসিক দলের সদস্যরা এ তথ্য জানান।

বিশেষজ্ঞ ও সামরিক কর্মকর্তারা জানান, মানব অপারেটররা ড্রোনটিকে নির্দিষ্ট একটি গ্যাস স্টেশনের দিকে যাওয়ার জন্য প্রোগ্রাম করেছিলেন। তবে কাছাকাছি পৌঁছানোর পর ড্রোনটি নিজেই তার নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্বাচন করে। সম্ভবত লক্ষ্য ছিল গ্যাস স্টেশনের প্রোপেন গ্যাসের ট্যাংক। এসব ট্যাংক শনাক্ত ও আঘাত করার জন্য ড্রোনটির এআইকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল।

ইউক্রেন যুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে যে ধরনের প্রযুক্তির আবির্ভাবের আশঙ্কা করা হচ্ছিল, এ ঘটনা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এমন এক ভবিষ্যতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যেখানে আকাশে ঘুরে বেড়ানো প্রাণঘাতী রোবট নিজেরাই জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নেবে।

জাপোরিঝঝিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার কর্নেল সেরহি মিনায়েভ বলেন, এটি পুরো বিশ্বের জন্য ঝুঁকি। কয়েক বছরের মধ্যে আমরা ‘‌টার্মিনেটর’ সিনেমার মতো পরিস্থিতিতে বাস করব। এটা কোনো রসিকতা নয়। আঘাত হানার সিদ্ধান্ত এখন যন্ত্র নিচ্ছে।

হামলার ধ্বংসাবশেষ এবং জাপোরিঝঝিয়ায় চালানো অন্যান্য হামলার ড্রোন বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞ ও সামরিক কর্মকর্তারা জানান, এসব ড্রোনে এনভিডিয়ার বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা ক্ষুদ্র কম্পিউটার বা মিনি-কম্পিউটার ছিল। লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে এসব কম্পিউটারই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত এআই ব্যবস্থা পরিচালনাকারী চিপের বড় অংশই তৈরি করে এনভিডিয়া।

ড্রোনে এনভিডিয়ার মডিউল পাওয়া এবং কোনো অ্যান্টেনা না থাকায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা কমান্ডাররা ধারণা করেন, অস্ত্রগুলো স্বয়ংক্রিয় এআই ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল। পরবর্তী তদন্তেও এ ধারণা নিশ্চিত হয়।

স্বয়ংক্রিয় এআই ব্যবস্থা হাজার হাজার ছবির মাধ্যমে ‘নদী’, ‘সামরিক ট্রাক’ বা ‘মানুষ’-এর মতো বিভিন্ন শ্রেণীর বস্তু শনাক্ত করতে প্রশিক্ষিত হতে পারে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনকারী ড্রোনগুলো ক্যামেরার মাধ্যমে এসব বস্তু শনাক্ত করে মানব পাইলটের তুলনায় আরো নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারে।

এ ধরনের অস্ত্রের বিরোধীরা বলছেন, মানুষের হস্তক্ষেপ না থাকলে ড্রোনের ভুল করার এবং যুদ্ধের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিক ও যোদ্ধার মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

৬ জুলাই গ্যাস স্টেশনে চালানো হামলায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনকারী এআই ব্যবহারের ঘটনাটি এ ধরনের ব্যবস্থা-সজ্জিত রুশ ড্রোনের হামলায় বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা হতে পারে বলে জানিয়েছেন ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) ওয়াধওয়ানি এআই সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো কাটেরিনা বন্ডার। তার মতে, ড্রোনে থাকা এনভিডিয়া মডিউলটি রাশিয়া স্বয়ংক্রিয় এআই নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।

-দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

আরও