ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন প্রায় সমানে সমান। আগামী মঙ্গলবারের সাধারণ নির্বাচনের আগে সমর্থকদের সক্রিয় রাখা, ভোটারদের আকৃষ্ট করা এবং প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইন জগতেও।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদন অনুসারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিজ্ঞাপন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্মিত বিকৃত ভিডিওর রমরমা অবস্থা ইসরায়েলে। প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ ক্ষমতায় এলে ভবিষ্যৎ ভয়াবহ হবে—এমন চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে এসব প্রচারণা। তবে কোন পক্ষের প্রচার, তার ওপর নির্ভর করে সেই চিত্রায়নের ধরন বদলে যাচ্ছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ গত বৃহস্পতিবার জানায়, ইরান সরকারকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে তৈরি কয়েক ডজন অনলাইন বটকে এখন নেতানিয়াহু ও তার দল লিকুদ পার্টির পক্ষে প্রচার চালাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব বট বিরোধী শিবিরের নেতা গাদি আইজেনকট ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছে এবং তাদের বিজয়ের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে ভোটারদের সতর্ক করছে।
দুই শিবিরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এআই-নির্মিত ভিডিও ও ডিপফেক ছড়াচ্ছে। কয়েকটি ভিডিওতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার আগে নিজের ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে দেখা যায় নেতানিয়াহুকে। অন্য ভিডিওগুলোতে বিরোধী পক্ষকে আরব দলগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী এসব দলকে আসন্ন নির্বাচনে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচনী অস্ত্র হিসেবে প্রযুক্তি
হাদাশ, বালাদ ও তাল আলাদাভাবে পরিচিত দলগুলোর জোট বামপন্থী জয়েন্ট লিস্ট বং ইউনাইটেড আরব লিস্ট নামে পরিচিত রা’আমের বিরুদ্ধে প্রচারে বিপুল সম্পদ ব্যবহার করেছে ইসরায়েলের ডানপন্থীরা। ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বড় একটি অংশ এ দুটি জোটের একটিকে সমর্থন করেন। সংসদ নির্বাচনের আগে সব দলই আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
নির্বাচনের দিন ভোটারদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য লিকুদ পার্টি ‘ইলেক্টর’ নামের একটি অ্যাপ ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিল। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি অ্যাপটির ব্যবহার সীমিত করে। এর পরিবর্তে দলটি ‘ভিক্টরি ২৬’ নামে একটি নতুন অ্যাপ ব্যবহার করবে।
ইলেক্টরের বিপরীতে নতুন অ্যাপটি ভোটারদের পরিচয় প্রকাশ করে না। তবে এর মাধ্যমে লিকুদ পার্টির কর্মী ও কর্মকর্তারা কোন এলাকায় ভোটার উপস্থিতি কম, তা শনাক্ত করতে পারবেন। পাশাপাশি ভোট দেয়া ব্যক্তিদের নাম হাতে লিখে তালিকাভুক্ত করে যারা তখনো ভোট দেননি, তাদের লক্ষ্য করে প্রচার চালানো সম্ভব হবে।
অ্যালগরিদম, কম্পিউটেবিলিটি ও এআই নিয়ে গবেষণারত পিএইচডি গবেষক সেবাস্তিয়ান বেন ড্যানিয়েল বলেন, ইলেক্টর ও এ ধরনের কর্মসূচি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বর্তমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতার তুলনায় খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের। এ ধরনের প্রযুক্তি বিকাশের জন্য ইসরায়েলের হাতে আদর্শ পরীক্ষাগার রয়েছে।
সামান্য ব্যবধান, তীব্র লড়াই
সম্প্রতি ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ এআই দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করে বিতর্কের জন্ম দেন। ভিডিওতে সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্ট, একজন বিচারপতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ থেকে সহিংসভাবে টেনে নিয়ে যেতে দেখা যায়। ডানপন্থী সরকারের বিচারিক নজরদারি সীমিত করার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করায় তারা প্রায়ই সরকারের সমালোচনার লক্ষ্য হন।
যুক্তরাজ্যের এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ও ভোটারদের আচরণ এবং নির্বাচনী কৌশলবিশেষজ্ঞ রই জুর বলেন, অনলাইন প্রচার বিশেষভাবে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। এআই, অ্যালগরিদম ও তথ্য ব্যবস্থাপনাকে ব্যবহার করে আমরা যাকে আবেগভিত্তিক মেরুকরণ বলি, তা আরো দৃঢ় করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানীরা এ শব্দ দিয়ে রাজনৈতিক শিবিরগুলোর মধ্যে বিভাজন গভীর হওয়া এবং প্রতিপক্ষের প্রতি শত্রুতা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতাকে বোঝান।
এবারের নির্বাচনে ছোট দলগুলোর সাফল্য এবং সামগ্রিক ভোটার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে প্রচারের এই কৌশল বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।