প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও কার্বন ডেটিংয়ের তথ্য

মহেঞ্জোদারোর নগরসভ্যতার বয়স প্রায় ৫৩০০ বছর

সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম নগর কেন্দ্র মহেঞ্জোদারোর নগরায়ণ সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণা বদলে দিচ্ছে সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও রেডিওকার্বন ডেটিং।

নতুন পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বছর আগে থেকে এখানে একটি ‘আদি নগর পর্যায়’ শুরু হয়েছিল, যা ১৯৫০ সালে ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক মর্টিমার হুইলারের আবিষ্কৃত পূর্ণাঙ্গ নগর পর্যায়েরও কয়েকশ বছর আগের।

পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের পুরাকীর্তি ও প্রত্নতত্ত্ব পরিদপ্তর (ডিজিএএ) সম্প্রতি মহেঞ্জোদারোর ‘স্তূপ মাউন্ড’সংলগ্ন এলাকায় একটি বিশাল প্রতিরক্ষা প্রাচীরের সন্ধান পেয়েছে। সাত মিটার পুরু এ ইটের প্রাচীরটি খননের মূল উদ্দেশ্য ছিল নগরীর সামগ্রিক নকশা ও সময়কাল নির্ণয় করা।

ডিজিএএর বিবৃতি অনুযায়ী, রেডিওকার্বন ডেটিং নিশ্চিত করেছে খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০-২৬০০ অব্দে (কোট দিজি বা আদি হরপ্পা পর্যায়) মহেঞ্জোদারোতে মানুষের বসতি ছিল। ১৯৫০ সালে মর্টিমার হুইলার যখন এখানকার ধ্বংসাবশেষ প্রথম আবিষ্কার করেন, তখন এর সময়কাল ধরা হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ২৮০০-২৬০০ অব্দ। নতুন পাওয়া তথ্যে এ সভ্যতার প্রাচীনত্ব আরো কয়েকশ বছর পিছিয়ে গেছে।

ডিজিএএর বিবৃতিতে আরো জানানো হয়েছে, বিখ্যাত স্তূপ মাউন্ডের পশ্চিমে সমতলভূমিতে নতুন খননের ফলে নগরীর সীমানা প্রাচীরের পাঁচটি নতুন রেডিওকার্বন ডেটিং পাওয়া গেছে। হুইলার এক সময় এ প্রাচীরটিকে বন্যা রক্ষার বাঁধ বা ‘বুন্দ’ হিসেবে ভুল শনাক্ত করেছিলেন।

এর আগে ভূগর্ভস্থ পানির কারণে খননকারীরা প্রাকৃতিক মাটির স্তর পর্যন্ত পৌঁছতে পারেননি। তবে এবার ডিজিএএ ও সিন্ধু এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার সোসাইটি (এসইএএস) যৌথভাবে হুইলারের সেই পুরনো পরিখাটি পুনরায় খনন করেছে।

প্রাচীরটির নিম্নস্তরের মৃৎপাত্র ও কার্বন নমুনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রাথমিক কাঠামোটি আদি হরপ্পা বা কোট দিজি পর্বের শেষ দিকে আনুমানিক ২৭০০-২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নির্মিত হয়েছিল, যা পূর্ণাঙ্গ হরপ্পা যুগ শুরুর প্রায় ১০০ বছর আগে।

প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক বি আর মনি এ আবিষ্কারের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, এর আগে ভূগর্ভস্থ পানির কারণে মহেঞ্জোদারোর একদম আদি স্তরে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এখন গভীর খননের ফলে এর প্রাথমিক পর্যায় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। হরপ্পা এবং ভারতের কালীবাগান ও কুনালের মতো স্থানগুলোতেও একই ধরনের আদি সাংস্কৃতিক স্তর পাওয়া গেছে। এটি প্রমাণ করে নগরায়ণ হঠাৎ করে ঘটেনি, বরং দীর্ঘ সময় ধরে এটি বিবর্তিত হয়েছে।

ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব হিস্টোরিক্যাল রিসার্চের (আইসিএইচআর) জুনিয়র রিসার্চ ফেলো দিশা আহলুওয়ালিয়া বলেন, ‘এ বিশেষ স্তরটি সম্পর্কে আগে জানা ছিল না। আগের খননকার্যগুলোর মাধ্যমে বোঝা গিয়েছিল মহেঞ্জোদারোর মাত্র একটি পর্যায় রয়েছে—পূর্ণাঙ্গ নগর পর্যায়। অর্থাৎ এর জনবসতির ব্যাপ্তি ৮০০ বছরের বেশি নয়। কিন্তু নতুন এ তথ্য প্রমাণ করে এর স্থায়িত্ব ৮০০ বছরেরও বেশি এবং এটি আদি পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত।’

ইউনেস্কোর তথ্যমতে, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের শুরুতে দক্ষিণ এশিয়ায় মহেঞ্জোদারো ছিল শ্রেষ্ঠ সংরক্ষিত জনপদ। সিন্ধু প্রদেশের লারকানা শহর থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। সিন্ধু নদের ডান তীরে অবস্থিত মহানগরীটি মূলত পোড়া ইটের তৈরি। এখানকার পরিকল্পিত নগর কাঠামোর মধ্যে ছিল গণস্নানাগার, ধর্মীয় কমপ্লেক্স, উন্নত নিষ্কাশন ব্যবস্থা, কূপ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বড় আকারের শস্যাগার।

১৯২০ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ আর ডি বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাচীন এ নগরীর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন। পরে ১৯২৪-২৬ ও ১৯৫০-এর দশকে বড় আকারে খনন হয়। ২০২৫-২৬ সালে নতুন করে কয়েক দফায় খনন পরিচালিত হয়েছে। এর নেতৃত্বে ছিলেন পাকিস্তানি প্রত্নতাত্ত্বিক আসমা ইব্রাহিম, আলী লাশারি ও যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জোনাথন মার্ক কেনয়ার।

নতুন আবিষ্কৃত তথ্য অনুযায়ী, নগর প্রাচীরের মধ্য ও ওপরের স্তরগুলো খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ অব্দের হরপ্পা পর্যায়ে নির্মিত। প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসতি থাকা নগরীটি খ্রিস্টপূর্ব ১৭০০ অব্দের দিকে পরিত্যক্ত হয়। তবে এগুলো খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ অব্দ পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে।

নতুন আবিষ্কার মহেঞ্জোদারোর নগরায়ণের সময়কাল নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এটি প্রাক-নগর পর্যায়ের ইঙ্গিত দিলেও সরাসরি নগরায়ণ ৩৩০০ খ্রিস্টপূর্বে শুরু হয়েছে এমন দাবি করা ঠিক নয়।

দিশা আহলুওয়ালিয়ার মতে, নতুন পাওয়া পর্যায়টি হলো ‘প্রি-আরবান’ বা প্রাক-নগর পর্যায়। তাই সরাসরি নগরায়ণ ৩৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের বলার সুযোগ নেই।

তবে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) অতিরিক্ত মহাপরিচালক সঞ্জয় কুমার মঞ্জুল মনে করেন, এ আবিষ্কার প্রতিরক্ষা প্রাচীর ও নগর বৈশিষ্ট্যের ইতিহাসকে কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘হরপ্পা সভ্যতার ভিত্তি যে আগে ভাবার চেয়েও প্রাচীন ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকেই একটি ‘আধা-নগর’ বা আদি নগর পর্যায়ের উত্থান আমরা দেখতে পাচ্ছি।’

মঞ্জুল আরো বলেন, মহেঞ্জোদারো বিশ্বের প্রাচীনতম শহর কিনা, তা নিয়ে এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করার জন্য আরো জোরালো প্রমাণের প্রয়োজন থাকলেও এটি যে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন নগর কেন্দ্র, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মহেঞ্জোদারোর পাশাপাশি হরপ্পা, কালীবাগান ও রাখিগড়ির মতো অঞ্চলগুলোও একই সাংস্কৃতিক পটভূমিতে সমান্তরালভাবে বিকশিত হয়েছিল। সব মিলিয়ে পুরো সিন্ধু-সরস্বতী অববাহিকা জুড়ে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের দিকেই একটি সুপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল।

আরও