জবাবে জর্ডান, বাহরাইন ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত করেছে তেহরান। একই সময়ে সৌদি আরবের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম চার সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। খবর রয়টার্স।
গতকাল ভোরে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় ৫ ঘণ্টাব্যাপী হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানে হামলা চালাল মার্কিন বাহিনী। হামলার আগে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়।
সেই সঙ্গে মার্কিন হামলার জবাবে জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সেনাঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। জর্ডানের দাবি, তারা চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। পাশাপাশি বাহরাইন জানায়, দেশটি লক্ষ্য করে চালানো একটি ইরানি আকাশ হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ইরানি হামলা প্রতিহতের দাবি করেছে উপসাগরীয় আরেক দেশ কুয়েত।
উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে সৌদি আরবের একটি তেলবাহী ট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। হামলার পর উপসাগরীয় নৌপথে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গতকাল সারা দিন হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি ছিল অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে।
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। ইরানের প্রণালি বন্ধের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর পুনরায় অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাহাজগুলোর কাছ থেকে ২০ শতাংশ ফি আদায়ের প্রস্তাবও দেন তিনি।
তবে আইন বিশেষজ্ঞ ও শিপিং কোম্পানিগুলোর তীব্র আপত্তি এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার মুখে এ ঘোষণার মাত্র একদিনের মাথায় নিজের সিদ্ধান্ত থেকে পুরোপুরি ইউ টার্ন নেন ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া নতুন এক পোস্টে ২০ শতাংশ মাশুল প্রত্যাহারের কথা জানিয়ে লেখেন, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকে বড় ধরনের ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ’ চুক্তি আদায়ের বিনিময়ে এ ফি মওকুফ করা হয়েছে।
তবে মাশুল প্রত্যাহার করলেও ইরানের ওপর পূর্ণ সামরিক অবরোধের ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান ছাড়া বাকি সব দেশের জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে। ইরানের মিথ্যাবাদী ও হিংস্র নেতৃত্বের কারণেই দেশটি আজ সম্পূর্ণ ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।’
চলতি বছরের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উপসাগরীয় যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যে এক পৃষ্ঠার শান্তি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় তার ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ইয়েজিদ সায়েগের মতে, দুই পক্ষের কেউই আপাতত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না। বিশেষ করে ট্রাম্পের জন্য এর বড় রাজনৈতিক মূল্য রয়েছে। তবে ভুল হিসাব বা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।
এ সামরিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। গতকাল বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম এক লাফে ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৭ দশমিক ৪৯ ডলারে উঠে যায়, যা গত চার সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের মাশুল প্রত্যাহারের ঘোষণার পর বাজার কিছুটা শান্ত হয় এবং দাম সামান্য কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৬ দশমিক ১৯ ডলারে নেমে আসে।