বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের তুলনায় বহু গুণ বেশি রাজনৈতিক ক্ষমতায় পৌঁছানোর সুযোগ পান। অক্সফামের বার্ষিক বৈষম্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাধারণ নাগরিকের তুলনায় একজন ধনকুবের প্রায় ৪ হাজার গুণ বেশি সরকারি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রাখেন।
২০২৬ সালের শুরুতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনকে সামনে রেখে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফাম। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৩ সালে বিশ্বের ২০২৭ জন বিলিয়নেয়ারের মধ্যে ৭৪ জন সরাসরি সরকারের নির্বাহী বা আইনসভা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। অর্থাৎ, একজন বিলিয়নেয়ারের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। যেখানে একজন সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে এ সম্ভাবনা মাত্র ০.০০০৯ শতাংশ। সহজ কথায়, সাধারণ মানুষের তুলনায় বিলিয়নেয়ারদের ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা চার হাজার গুণ বেশি।
প্রতিবেদনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে সম্পদশালী ক্যাবিনেট গঠন করেছেন। এ প্রশাসন বড় ধরণের কর ছাড় ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সংকোচনের মাধ্যমে ধনীদের আরো সুবিধা দিচ্ছে বলে অক্সফাম মনে করে। কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, আর্জেন্টিনা থেকে শুরু করে নাইজেরিয়া পর্যন্ত সর্বত্রই শীর্ষ ধনীরা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে ব্যবসায়িক সুবিধা ও কর ছাড় আদায় করে নিচ্ছেন।
বিলিয়নেয়ারদের স্বর্ণালী বছর
অক্সফামের তথ্যমতে, ২০২৫ সাল বিশ্বজুড়ে ধনকুবেরদের সম্পদ বৃদ্ধির গতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গত পাঁচ বছরের গড় হারের তুলনায় গত বছর ধনীদের সম্পদ বেড়েছে তিন গুণ দ্রুতগতিতে। বর্তমানে তাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ রেকর্ড ১৮ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। শুধু এক বছরেই তাদের সম্মিলিত সম্পদ বেড়েছে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার—যা বিশ্বের দরিদ্রতম অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মোট সম্পদের প্রায় সমান।
অক্সফামের মতে, এই সম্পদ বৃদ্ধির দুই-তৃতীয়াংশই এক বছরের জন্য বৈশ্বিক দারিদ্র্য দূর করতে যথেষ্ট হতো। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে বিলিয়নেয়ারদের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার এবং দেশটিতে বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা ৯৩২—যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। অক্সফামের আশঙ্কা, ২০২৬ সালে ইলোন মাস্কের সম্পদ বর্তমান গতিতে বাড়লে তিনি বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার হতে পারেন।
স্থবির দারিদ্র্য বিমোচন
একদিকে ধনীদের সম্পদ আকাশচুম্বী হচ্ছে, অন্যদিকে দারিদ্র্য বিমোচনের হার থমকে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ (৩৮০ কোটি মানুষ) দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছেন। ২০১৯ সালের পর থেকে দারিদ্র্য পরিস্থিতির বিশেষ কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যায়নি।
অক্সফ্যামের সুপারিশসমূহ
অক্সফাম আমেরিকার জ্যেষ্ঠ নীতি নির্ধারক রেবেকা রিডেলের মতে, অতিধনীদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা করাই বৈষম্য কমানো ও গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র পথ। আর তাই এ চরম বৈষম্য দূর করতে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রয়েছে:
১. শ্রমিকের মজুরি বাড়ানো ও তাদের অধিকার নিশ্চিত করা।
২. বড় কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধ করা।
৩. অতিধনীদের ওপর উচ্চহারে কর আরোপ করা ও নির্বাচনী তহবিলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
৪. সর্বজনীন জনসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।