জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পাল্টে যাচ্ছে কিরিবাতির ‘টুনা অর্থনীতি’

যদি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ অপরিবর্তিত থাকে, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে ১ কোটি ডলারেরও বেশি রাজস্ব হারাতে পারে কিরিবাতি

বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি টুনা মাছের যোগান দেয় প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলো। এরই ৩৩টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত ছোট্ট দেশ কিরিবাতি। আয়তনে আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরের সমান হলেও দেশটির সমুদ্রসীমা বা এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন ভারতের চেয়েও বিশাল—প্রায় ৩৪ লাখ বর্গকিলোমিটার।

তবে ভূ-রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক মানচিত্রে কিরিবাতির সবচেয়ে বড় পরিচয় এর ‘টুনা অর্থনীতি’। দেশটির সরকারি আয়ের ৭০ শতাংশই আসে বিদেশি জাহাজগুলোর কাছে টুনা মাছ ধরার লাইসেন্স বিক্রির মাধ্যমে।

কিরিবাতির জলসীমায় মাছ ধরার জন্য জাপান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোকে চড়া মূল্যে লাইসেন্স কিনতে হয়। সরকারি তথ্যমতে, ২০২৪ সালে মাছ ধরার লাইসেন্স বিক্রি করে ১৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় করেছে দেশটি। ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশটির মোট জাতীয় আয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এবং জিডিপি-র দুই-পঞ্চমাংশ এসেছে এই খাত থেকে।

গ্লোবাল টুনা মার্কেটের বার্ষিক মূল্য প্রায় ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। মৎস্য বিশেষজ্ঞ সাইমন ডিফি জানান, সুপারমার্কেটে টুনা মাছের প্রতি ১০টি ক্যানের ৫টিই আসে পশ্চিম মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে, যার বড় অংশই কিরিবাতির অবদান। পাপুয়া নিউ গিনির মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর বিকল্প আয়ের উৎস থাকলেও কিরিবাতির সম্বল কেবল মাছ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা মাত্র ২ মিটার; এখানে না আছে সুপেয় পানি, না আছে চাষযোগ্য জমি।

তবে এ সমুদ্রই কিরিবাতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে, যা টুনা মাছের আবাসস্থলের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। টুনা মাছ তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তনেও অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, সাগরের উপরিভাগের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় টুনা মাছ শীতল পানির খোঁজে পূর্ব দিকে সরে যেতে পারে। আর টুনা যদি কিরিবাতির সমুদ্রসীমা ত্যাগ করে, তবে বিদেশি জাহাজগুলো আর লাইসেন্স কিনতে আগ্রহী হবে না।

কিরিবাতির মৎস্য মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলন অনুযায়ী, যযদি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ অপরিবর্তিত থাকে, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশটি বছরে ১ কোটি ডলারেরও বেশি রাজস্ব হারাতে পারে। তবে নিঃসরণ কমানো সম্ভব হলে মাছের এই দেশান্তর ঠেকানো যেতে পারে। টুনা মাছ কেবল রাজস্বের উৎস নয়, এটি কিরিবাতীবাসীদের প্রধান প্রোটিন। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এই মানুষগুলো বছরে গড়ে ১০০ কেজি মাছ খায়, যেখানে জাপানিরা খায় ২২ কেজি আর আমেরিকানরা মাত্র ৯ কেজি।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্থানীয় জেলেরা এখন থেকেই মাছ কম পাচ্ছেন। ফলে বাধ্য হয়ে দ্বীপরাষ্ট্রটিকে আমদানিকৃত খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা একদিকে যেমন খরচ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে পুষ্টির মান কমিয়ে দিচ্ছে। ক্রমবর্ধমান নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি এ সংকটকে আরো প্রকট করে তুলছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘের গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ১৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলারের একটি প্রকল্প চালু করেছে। এর মাধ্যমে মাছের গতিবিধি নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। বিদেশি জাহাজের কাছে শুধু লাইসেন্স বিক্রি না করে নিজেই মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ক্যানিং প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে কিরিবাতির সরকার। সেইসঙ্গে পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অফশোর সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের মাধ্যমে আয়ের উৎস বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এছাড়া কেবল টুনা মাছের ওপর নির্ভর না করে মিল্কফিশ, স্ন্যাপারসহ অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ চাষের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

আরও