আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার

যুদ্ধের ময়দানে নতুন অস্ত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কারা নেতৃত্ব দিচ্ছে এই দৌড়ে?

আধুনিক সামরিক খাতের নতুন নিয়ন্ত্রক কি তবে এআই?

দূর থেকে বসে হামলা চালানোর সেই প্রযুক্তি এখন আরো বিস্তৃত হয়েছে। ক্লাউড কম্পিউটিং, স্বয়ংক্রিয় ড্রোন, লক্ষ্য শনাক্তকরণ, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত— এ সব ক্ষেত্রেই এখন এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা বাজেটের বড় অংশ এখন যাচ্ছে এআই প্রযুক্তির উন্নয়নে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার কোটি ডলারে।

একসময় যুদ্ধ মানেই ছিল ট্যাংক, যুদ্ধবিমান, কামান কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তি। এখন সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আধুনিক যুদ্ধের বড় অংশ পরিচালিত হচ্ছে কম্পিউটারের পর্দা থেকে, যেখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। ফলে বহু দশকের পুরোনো সামরিক শিল্প এখন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন এক সামরিক ব্যবস্থায়।

এ পরিবর্তনের শুরু যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন কর্মসূচির সময় থেকে। দূর থেকে বসেই হামলা চালানোর সেই প্রযুক্তি এখন আরো বিস্তৃত হয়েছে। ক্লাউড কম্পিউটিং, স্বয়ংক্রিয় ড্রোন, লক্ষ্য শনাক্তকরণ, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত— এ সব ক্ষেত্রেই এখন এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা বাজেটের বড় অংশ এখন যাচ্ছে এআই প্রযুক্তির উন্নয়নে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার কোটি ডলারে।

যুক্তরাজ্যের হ্যাম্পশায়ারে ফার্নবোরো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারশোতে প্রদর্শিত অ্যান্ডুরিলের চালকবিহীন যুদ্ধবিমান ‘ফিউরি’। ছবি: রয়টার্স

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রেথিয়ন ইউকের নেতৃত্বাধীন ওমনিয়া ট্রেনিংয়ের সঙ্গে ১৫ বছরের ২০০ কোটি পাউন্ডের চুক্তি করেছে। এর আওতায় প্রতিবছর প্রায় ৬০ হাজার সেনাকে এআই ব্যবহার করে যুদ্ধ পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। একই সময়ে ন্যাটো আকাশ প্রতিরক্ষা তথ্যব্যবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্ডুরিল, প্যালান্টির ও ফ্রান্সের অ্যাথিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে। অ্যান্ডুরিলের ‘ল্যাটিস’ সফটওয়্যার বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করে যুদ্ধক্ষেত্রের তাৎক্ষণিক চিত্র তৈরি করতে পারে।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) সামরিক এআই শিল্পকে চারটি ভাগে ভাগ করেছে। প্রথমটি হলো ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বা ডিফেন্স প্রাইমস। লকহিড মার্টিন, আরটিএক্স, নর্থরপ গ্রুম্যান, বিএই সিস্টেমস ও জেনারেল ডায়নামিকস এ তালিকায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্রব্যবস্থার সঙ্গে এআই যুক্ত করছে। যেমন লকহিড মার্টিন এফ–৩৫ যুদ্ধবিমানে এমন এআই প্রযুক্তি পরীক্ষা করছে, যা দ্রুত শত্রু বিমান শনাক্ত করতে পারে। এলথ্রি হ্যারিসের ক্যামেরা এবং শিল্ড এআইয়ের প্রযুক্তিও তাৎক্ষণিক লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যবহৃত হচ্ছে।

দ্বিতীয় শ্রেণির প্রতিষ্ঠানগুলো নিওপ্রাইমস বা প্রতিরক্ষা স্টার্টআপ। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত প্যালান্টির। যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রজেক্ট ম্যাভেন’-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি উপগ্রহ, ড্রোন ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতেও এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে। ইরান সংঘাতের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ম্যাভেন প্রায় এক হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করেছিল। অ্যান্ডুরিলের ‘ল্যাটিস’ প্ল্যাটফর্মও একই ধরনের কাজ করে। এটি ড্রোন, সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় যানকে একটি সমন্বিত কমান্ড নেটওয়ার্কে যুক্ত করে।

তৃতীয় ধাপে রয়েছে বিগ টেক প্রতিষ্ঠান। গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস), ওরাকল, এনভিডিয়া, ওপেনএআই, স্পেসএক্স ও রিফ্লেকশনের মতো প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি পেন্টাগনের গোপন নেটওয়ার্কে এআই প্রযুক্তি সরবরাহের চুক্তি পেয়েছে। এর লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে ‘এআই-ফার্স্ট’ বাহিনীতে পরিণত করা। বিশ্বের প্রায় ৬৭ শতাংশ ক্লাউড অবকাঠামোও এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে।

ছবি: আল জাজিরা

সবশেষে রয়েছে ফাউন্ডেশনাল মডেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও ইউরোপের মিস্ট্রাল এআই এ শ্রেণিতে পড়ে। তাদের তৈরি মূল এআই মডেলের ওপর ভিত্তি করেই অন্য প্রতিষ্ঠান সামরিক প্রযুক্তি তৈরি করে। চীনও পিছিয়ে নেই। মেটার ‘লামা’ মডেল ব্যবহার করে পিপলস লিবারেশন আর্মির জন্য ‘চ্যাটবিট’ নামে একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।

পেন্টাগনের হিসাবে, সামরিক এআইয়ে চীনের বার্ষিক ব্যয়ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি, প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কোটি ডলার। সম্প্রতি আলিবাবা, বাইদু, বিওয়াইডি, এনআইও, রোবোসেন্স ও ইউনিট্রিকে চীনা সামরিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় যুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

মজার বিষয় হলো, একসময় অনেক এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান সামরিক কাজে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিরোধিতা করত। কিন্তু অবস্থান বদলাতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালে ওপেনএআই সামরিক ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। একই বছর প্যালান্টির ও অ্যানথ্রপিক অংশীদার হলেও পরে ক্লড মডেলের সামরিক ব্যবহার নিয়ে তাদের মধ্যে আইনি বিরোধও তৈরি হয়। সব মিলিয়ে স্পষ্ট, ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধুমাত্র ট্যাংক বা ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে ঘিরেও তৈরি হচ্ছে নতুন আন্তর্জাতিক সমীকরণ।

আরও