পপকর্ন-সিনেমায় যুদ্ধের বাস্তবতা থেকে কিছুক্ষণের মুক্তি গাজার কিশোরীদের

শুধু বিনোদন নয়, সিনেমাকে কেন্দ্র করে কিশোরীদের মানসিক সুস্থতা ও দৈনন্দিন নিরাপত্তা নিয়েও কথা বলেন আয়োজকেরা। সিনেমা শেষে গল্প ও চরিত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়। মেয়েদের নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে উৎসাহ দেয়া হয়। পাশাপাশি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত সীমারেখা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও হয়রানি থেকে সুরক্ষার মতো বিষয় নিয়েও বয়স উপযোগী আলোচনা হয়

সপ্তাহের একদিন গাজার দেইর আল-বালাহ’র পরিবেশ কিছুটা বদলে যায়। হাতে পপকর্ন, সামনে কার্টুন বা সিনেমা—কয়েক ঘণ্টার জন্য যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি আর কঠিন জীবন থেকে দূরে থাকার সুযোগ পায় একদল কিশোরী। তবে এটি কোনো সাধারণ সিনেমা হল নয়। একটি টিভি, কয়েকটি প্লাস্টিকের চেয়ার আর সামান্য আয়োজনেই তৈরি হয়েছে তাদের জন্য এ ‘সিনেমা অভিজ্ঞতা’।

১৪ বছর বয়সী নাটালি আল-হাতুম প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবারের অপেক্ষায় থাকে। সেদিন সকালে প্রস্তুত হয়ে মাকে বিদায় জানিয়ে সে যায় ওই কেন্দ্রে। সেখানে গিয়ে কিছু সময়ের জন্য যুদ্ধের বাস্তবতা ভুলে থাকতে পারে সে। গাজার রেমাল এলাকায় ছিল নাটালিদের বাড়ি। যুদ্ধ শুরুর পর বোমার আঘাতে বাড়িটি ধ্বংস হলে পরিবারের সঙ্গে মধ্য গাজার একটি ভাড়া করা ছোট কক্ষে আশ্রয় নেয় সে। যুদ্ধের সময় দাদা, দাদি ও এক চাচাতো ভাইকেও হারিয়েছে নাটালি।

বাস্তুচ্যুত ১১ থেকে ১৬ বছর বয়সী মেয়েদের জন্য এ আয়োজন করছে ইউনিয়ন অব মেডিকেল কেয়ার অ্যান্ড রিলিফ অর্গানাইজেশনস-ইউএসএ। সিনেমা দেখানোর পাশাপাশি থাকে খেলাধুলা ও নানা ধরনের দলীয় কার্যক্রম। শুরুতে প্রতিটি আয়োজনে ১৫ থেকে ২০ জন কিশোরী অংশ নিলেও এখন সে সংখ্যা বেড়ে ৩৫ থেকে ৪০ জনে দাঁড়িয়েছে।

১৫ বছর বয়সী রামা আবু মোহাম্মদের কাছে কেন্দ্রে ঢোকার অনুভূতিটা যেন ‘অন্য এক জগতে’ প্রবেশের মতো। তার ভাষায়, বাইরে যুদ্ধের চাপ ও বাস্তবতা থেকে এখানে কিছুক্ষণের জন্য বিচ্ছিন্ন হওয়া যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জায়গাটিকে সে নিরাপদ মনে করে।

শুধু বিনোদন নয়, সিনেমাকে কেন্দ্র করে কিশোরীদের মানসিক সুস্থতা ও দৈনন্দিন নিরাপত্তা নিয়েও কথা বলেন আয়োজকেরা। সিনেমা শেষে গল্প ও চরিত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়। মেয়েদের নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে উৎসাহ দেয়া হয়। পাশাপাশি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত সীমারেখা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও হয়রানি থেকে সুরক্ষার মতো বিষয় নিয়েও বয়স উপযোগী আলোচনা হয়।

মনোসামাজিক সহায়তাকারী জেহান আবু জানুনা বলেন, গাজার শিশুরা এমন অনেক কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, যা তাদের শৈশবের অংশ হওয়ার কথা ছিল না। তাই তারা চেষ্টা করেন তাঁবু, প্রচণ্ড গরম, পোকামাকড় ও প্রতিদিনের কঠিন বাস্তবতা থেকে শিশুদের কিছু সময়ের জন্য দূরে রাখতে।

আয়োজকদের মতে, সিনেমা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এর গল্প ও চরিত্রের অনুভূতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শিশুদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও আবেগ নিয়েও কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়। যুদ্ধের সময় তাঁবু কিংবা বাড়িতে নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় কিশোরীদের। সেসব পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হবে, তা জানা জরুরি।

সিনেমা শেষ হলে আবার বাস্তব জীবনে ফিরতে হয় মেয়েদের। তবু সেই এক-দুই ঘণ্টা যেন তাদের মানসিকভাবে কিছুটা শক্তি জোগায়। রামা বলে, মনে হয়, আমি আবার কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করে ফিরে যাচ্ছি। মনে হয়, নিজের ভেতরে জমে থাকা কিছুটা ভার কমাতে পেরেছি।

আল জাজিরা অবলম্বনে

আরও