প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও গাছের কোটর কমে যাওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় বন্যপ্রাণীর একটি অংশ মানুষের বাড়িকে বিকল্প আবাসস্থল হিসেবে বেছে নিচ্ছে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ছাদ, দেয়ালের ফাঁক, গ্যারেজ থেকে শুরু করে চিঠির বাক্স ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়ও আশ্রয় নিচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
গবেষকরা এক দশকের বন্যপ্রাণী উদ্ধারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ভবনে আশ্রয় নেয়া প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ব্রাশটেইল ও রিংটেইল পসাম। মোট ঘটনার প্রায় অর্ধেকই এ দুই প্রজাতির। এরপর রয়েছে মাইক্রোব্যাট ও বেয়ার-নোজড ওম্ব্যাট।
পিপল অ্যান্ড নেচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটিতে ভবনকে আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার করা প্রাণীর ২ হাজার ৪০০টি ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অধিকাংশ প্রাণীকে পাওয়া গেছে ছাদের ভেতরের অংশ, দেয়ালের ফাঁক, গ্যারেজ, শেড এবং বাড়ির নিচে। তবে প্রায় ১০ শতাংশ প্রাণী পাওয়া গেছে শোবার ঘর ও রান্নাঘরের মতো ঘরের ভেতরের জায়গায়।
গবেষণার প্রধান লেখক ও মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থপতি বেথানি কিস বলেন, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও গাছের কোটর হারিয়ে যাওয়ায় প্রাণীগুলো বিকল্প হিসেবে মানুষের তৈরি স্থাপনায় আশ্রয় নিচ্ছে। মানুষের কাছে এসব ঘটনা ব্যতিক্রম মনে হলেও বাস্তবে তা বেশ সাধারণ।
বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী সংস্থা ওয়াইল্ডলাইফ ভিক্টোরিয়ার তথ্যানুযায়ী, সম্প্রতি এক নারী রান্নাঘরের সিঙ্কের নিচে বাসন ধোয়ার সময় ছোট ছোট সুগার গ্লাইডার খুঁজে পান। একটি পাত্রের মধ্যে প্রথমে দুটি গ্লাইডারকে একসঙ্গে কুঁকড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে উদ্ধারকর্মীরা সেখানে আরো পাঁচটি গ্লাইডার খুঁজে পান।
অন্য এক ঘটনায় এক কোয়ালা একটি বাড়ির করিডর দিয়ে ঢুকে পড়ে। উদ্ধারকর্মীরা এসে দেখেন, প্রাণীটি শান্তভাবে বিছানায় বসে আছে। আরেকটি ঘটনায় একটি একিডনা ঘরে ঢুকে সরাসরি খাবারের আলমারিতে চলে যায়। সেখানে তাক থেকে বিভিন্ন জিনিস নামানোর সময় একটি ভারি ফুড প্রসেসরও টেনে নামানোর চেষ্টা করে প্রাণীটি।
মাইক্রোব্যাটও প্রায়ই মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। মেলবোর্নে সংস্কারকাজের সময় এক বাড়ির দেয়ালে আটটি লিটল ফরেস্ট ব্যাটের সন্ধান পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ছাদে বাদুড়ের বসবাস অস্বাভাবিক নয়। তারা সাধারণত বাড়ির ক্ষতি করে না এবং পোকামাকড়ের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
গবেষক কিস বলেন, যুক্তরাজ্যে নতুন ভবন নির্মাণের সময় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল তৈরির বিষয়টি ইতিমধ্যে নকশার অংশ করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায়ও বন্যপ্রাণীবান্ধব আলো, শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং পসাম বক্স বা পাখির বাসা তৈরির মতো ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
গবেষণার সহলেখক সারাহ বেকেসি বলেন, শহর ও আবাসিক এলাকায় বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি মানুষের মানসিক সুস্থতা বাড়ায়, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শক্তিশালী করে এবং শহরকে আরো স্বাস্থ্যকর ও সহনশীল করে তোলে।
গবেষকদের মতে, স্থাপত্যের লক্ষ্য শুধু প্রকৃতিকে দূরে রাখা নয়; মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করেও ভবনের নকশা করা সম্ভব।