আবারো বড় ধরনের সামরিক হামলা-পাল্টাহামলায় জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ইরানের দক্ষিণ উপকূলে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এতে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। এর জবাবে বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। গত জুলাইয়ের পর দুই দেশের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলা। খবর রয়টার্স।
নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। এশিয়া ও ইউরোপের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গতকাল দিনের শুরুতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৭ দশমিক শূন্য ৪ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়, যা জুলাইয়ের শেষ দিকের পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ওঠে ৯২ দশমিক ২৯ ডলারে। তবে পরে দাম কিছুটা কমে আসে। এর আগের দিন মঙ্গলবার ব্রেন্টের দাম ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৯৪ দশমিক ৬৫ ডলারে এবং ডব্লিউটিআই ৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৯০ দশমিক ২২ ডলারে লেনদেন শেষ করে।
গতকাল মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক স্থাপনা, মাইন স্থাপনের সক্ষমতা ও যোগাযোগ অবকাঠামোয় হামলা চালানো হয়েছে। হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি একাধিক স্থানেও হামলার খবর দিয়েছে ইরান।
ইরানের দাবি, সিরিকে একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালে মার্কিন হামলায় চার বছরের এক শিশুসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সর্বোচ্চ ৬৮ জন। সব মিলিয়ে রাতের হামলায় অন্তত ১২ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে তেহরান। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক কমান্ড বলেছে, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের জবাব আরো ‘ভারী, বিস্তৃত ও ধ্বংসাত্মক’ হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তাকারী দেশগুলোকেও পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান।
জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ১৩টি ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবেলা করেছে। এর মধ্যে ১০টি ভূপাতিত করা হয়। তিনটি প্রত্যন্ত এলাকায় পড়ে। ইরান দাবি করেছে, জর্ডানে তাদের হামলায় মার্কিন সেনারা নিহত হয়েছেন। তবে প্রাথমিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে মার্কিন কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সেখানে কোনো হতাহতের খবর নেই।
কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের আলী আল সালেম বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান। দেশটির অগ্নিনির্বাপণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি আবাসিক কমপ্লেক্সে ইরানি ড্রোন আঘাত হানার পর আগুন লাগে। এতে ক্ষয়ক্ষতি হলেও কেউ হতাহত হননি।
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটির অবস্থান কাতারে। ইরানের হামলার জন্য তেহরানকে ‘সম্পূর্ণ আইনগতভাবে দায়ী’ করেছে দেশটি। মার্কিন নৌবাহিনীর আঞ্চলিক সদর দপ্তর থাকা বাহরাইনও ড্রোন প্রতিহত করার তথ্য জানিয়েছে।
এছাড়া ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় এরবিলেও মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি। সেখানে কয়েকজন মার্কিন সদস্য নিহত হয়েছেন বলেও দাবি তেহরানের। তবে ইরাক কিংবা যুক্তরাষ্ট্র কেউই তা নিশ্চিত করেনি।
হরমুজ প্রণালিতে মাইনের আঘাতে দুটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করেছে ইরান। তেহরানের ভাষ্য, তারা যে নৌপথ বন্ধ ঘোষণা করেছে, সেখান দিয়ে মার্কিন সদস্যদের তত্ত্বাবধানে জাহাজ দুটি নেয়া হচ্ছিল।
গত জুলাইয়ে টানা দুই সপ্তাহ ইরানে তীব্র বোমাবর্ষণের পর আকস্মিকভাবে হামলা বন্ধ করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। তবে ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতে এখনো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, প্রতিবেশীদের ওপর হামলার সক্ষমতা নষ্ট এবং ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিবেশ তৈরির যে লক্ষ্য ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, তা অর্জিত হয়নি। অন্যদিকে ইরানও যুদ্ধ শেষে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আটকে থাকা অর্থ ফেরত এবং হরমুজ প্রণালির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ধরে রেখেছে।