ইরানে খামেনির শেষবিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু, সাতদিনে কী কী থাকছে

ইরানি সরকারের ধারণা, সাবেক সর্বোচ্চ নেতাকে বিদায়ের এ আয়োজনে প্রায় দুই কোটি মানুষের উপস্থিতি হতে পারে। ইরানে কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের জন্য এর আগে কখনও এত বড় পরিসরে প্রস্তুতি নেয়া হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন প্রক্রিয়ার প্রথম পর্বের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। সাতদিনের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে আজ শুক্রবার ভোরে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে আলী খামেনি এবং এবং তার সঙ্গে নিহত হওয়া অন্য ব্যক্তিদের মরদেহ নেয়া হয়। সেখানে প্রধান নামাজের কক্ষে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহগুলো রাখা হয়েছে। খবর বিবিসি ফার্সি, আল জাজিরা।

কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, প্রথমে মার্চ মাসে দাফনের পরিকল্পনা থাকলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় তা পিছিয়ে যায়। শুক্রবার তেহরানে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির মাধ্যমে শুরু হওয়া শোকানুষ্ঠান সাত দিন ধরে ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে চলবে।

খামেনিকে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া প্রথম বিদেশী অতিথিদের মধ্যে আছেন ইন্দোনেশিয়া ও আফগানিস্তানের ইসলামি আলেম এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। ইরানে স্বীকৃত বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও তেহরানে গেছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় যোগ দিতে। এছাড়া আলী খামেনির জানাজা ও রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে অংশ নিতে তেহরানে পৌঁছেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল।

দেশটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েক ডজন দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং মন্ত্রীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। প্রায় ৮০০ বিদেশী সাংবাদিক এ অনুষ্ঠান কভার করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ইরানি সরকারের ধারণা, সাবেক সর্বোচ্চ নেতাকে বিদায়ের এ আয়োজনে প্রায় দুই কোটি মানুষের উপস্থিতি হতে পারে। ইরানে কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের জন্য এর আগে কখনও এত বড় পরিসরে প্রস্তুতি নেয়া হয়নি। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রয়েছে শোক জানাতে আসা মানুষদের জন্য অসংখ্য সেবাকেন্দ্র (মাওকিব), ১০ লাখের বেশি দর্শনার্থীর থাকার ব্যবস্থা এবং জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের জন্য তেহরানের কেন্দ্রস্থলজুড়ে নির্ধারিত পথ। পুরো বিষয়টির নেতৃত্ব দিচ্ছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) তেহরানভিত্তিক প্রধান প্রাদেশিক ইউনিট মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোর।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, আলী খামেনির শেষবিদায়ের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে তেহরানের সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলো শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। যান চলাচলেও দেয়া হয়েছে বিধিনিষেধ। পাশাপাশি তেহরানের আকাশসীমা শুক্রবার আংশিকভাবে এবং সোমবার থেকে পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, এসব কর্মসূচিতে সব মিলিয়ে এক থেকে দুই কোটি মানুষের অংশগ্রহণ হতে পারে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ জনগণকে ব্যাপকভাবে জানাজায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই উপস্থিতিই হবে দেশের প্রতিশোধের বার্তা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, খামেনির দাফনসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতায় প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধিদল, বিভিন্ন খ্যাতিমান ব্যক্তি ও নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।

তিনি আরো বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আসছে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীসহ অন্তত ৮ জন সরকারপ্রধান এবং ১২টি দেশের পার্লামেন্টের স্পিকার আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেবেন। এছাড়া আরও অনেক দেশ তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী অথবা বিশেষ দূতের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল পাঠাবে। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও এই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

সাতদিনের আনুষ্ঠানিকতায় যা যা থাকছে

আগামীকাল শনিবার ভোর ৬টায় তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে, যেখানে দর্শনার্থীরা রোববার বিকাল পর্যন্ত তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবেন।

মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোরের কমান্ডার হাসান হাসানজাদেহ জানান, খামেনির কফিন একটি উঁচু মঞ্চে রাখা হবে। দর্শনার্থীরা ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে সেখানে প্রবেশ করে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ করে বের হতে পারেন।

এরপর সোমবার অনুষ্ঠিত হবে শোকযাত্রা। পরদিন মঙ্গলবারের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে তেহরানের দক্ষিণের কোম শহরে। সেখানে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান জামকারান মসজিদে জানাজার নামাজে ইমামতি করবেন শিয়াদের জ্যেষ্ঠ আলেম।

বুধবার খামেনির মরদেহ ইরাকের নাজাফে নেয়া হবে। এরপর কারবালায় ইসলামের খলিফা আলীর (যাকে শিয়া মুসলিমরা তাদের প্রথম ইমাম হিসেবে মানেন) সমাধিস্থলে আনুষ্ঠানিকতা পালন করে মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। এরপর আগামী বৃহস্পতিবার আলী খামেনির নিজ শহর মাশহাদে শিয়াদের অষ্টম ইমামের সমাধিস্থল এবং ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান ইমাম রেজার সমাধিস্থলে তাকে সমাহিত করা হবে।

এরপর সারা দেশে আরও ৪০ দিন শোকানুষ্ঠান চলবে। দাফনের প্রথম বার্ষিকী পর্যন্ত বিভিন্ন স্মরণসভা ও কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে।

দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ও তার ভাইবোনেরা বাবার দাফন উপস্থিত থাকবেন কি না- তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি। যুদ্ধ শুরু এবং সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তিনি অন্তরালে আছেন। সনশেষ গত মঙ্গলবার আয়োজক কমিটির সম্পাদক আলী আকবর পুরজামশিদিয়ান বলেন, মোজতবা অনুষ্ঠানে থাকবেন কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের কার্যালয় এবং সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় থেকে জানানো হবে।

আরও