ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী-হুথি বিদ্রোহীদের লড়াইয়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি

ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের শিকড় অনেক পুরনো। ২০১৪ সালে হুথিরা দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়। এর পরের বছর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরব। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বড় ধরনের লড়াই বন্ধ হলেও চলতি মাসে হুথিদের নতুন অগ্রযাত্রার পর আবার সংঘাত তীব্র হয়ে উঠেছে

ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে নতুন করে লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে। কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা পুনর্দখলে হুথিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালাচ্ছে সরকারি বাহিনী। কয়েক দিন আগে মোখা দখল করে নেয় ইরান-সমর্থিত হুথিরা। এরপর বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে চলে যায়। লোহিত সাগর হয়ে বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে যাওয়ায় আঞ্চলিক সংঘাত আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খবর আল জাজিরা।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর বরাতে দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা সাবার খবরে বলা হয়, রোববার মোখা বন্দরের কাছে হুথিদের কয়েকটি যানবাহন ও অস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। এতে হুথিদের কয়েকজন সদস্য হতাহত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। মোখা-ধুবাব সড়কেও হুথিদের যানবাহন ও সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।

দেশটির প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সদস্য ও মারিবের গভর্নর সুলতান আল-আরাদা জানিয়েছেন, নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ের প্রধান কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মানদেব, তাইজ, মারিব, আল-জাওফ ও ধালেয়া। তাইজে স্থলযুদ্ধ ও পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। মারিব ও আল-জাওফে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার পাশাপাশি তা আরো বাড়ানোর চেষ্টা করছে সরকারি বাহিনী। উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ ধালেয়াতেও লড়াই অব্যাহত রয়েছে।

সংঘাতে সৌদি আরবও জড়িয়ে পড়েছে। হুথিদের অভিযোগ, গত ৪৮ ঘণ্টায় ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়েছে ১২৯টি সৌদি যুদ্ধবিমান। হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, তাইজ, মারিব, হোদেইদা, আল-জাওফ, সাদা, আমরান ও হাজ্জাহ প্রদেশে এসব হামলা চালানো হয়েছে। সৌদির খামিস মুশাইত ও তাইফের ঘাঁটি থেকে এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমান এসব হামলায় অংশ নেয় বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে এসব বিমান হামলার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি সৌদি আরব। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশার মতে, হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত বাহিনীকে সৌদি আরব বিমান সহায়তা দিচ্ছে বলেই ধরে নেয়া যায়। তার ভাষ্য, বিমান হামলা হুথিদের অগ্রযাত্রা ধীর করতে পারে। তবে তাদের ঠেকাতে স্থলবাহিনীর ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে হুথিরা। সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, জাজান অঞ্চলে হুথিদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দুজন আহত হয়েছেন। একটি মসজিদসহ কয়েকটি ভবন ও কয়েকটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে আবহা, খামিস মুশাইত, জাজান ও নাজরান শহরের বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হুথিদের হামলায় ৭৩ জন আহত হওয়ার কথা জানানো হয়।

লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে সংঘাতের কারণে ৮২ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টাতেই দুই হাজারের বেশি ইয়েমেনি পালিয়ে জিবুতিতে পৌঁছেছে। মোখা দখলের পর সেখানে জাতিসংঘের কার্যক্রম জোরদার থাকায় ত্রাণ সংস্থাগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছানো আরো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন ইয়েমেনে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার প্রধান আবদুসাত্তোর এসোয়েভ।

হুথিদের অগ্রযাত্রাকে স্বাগত জানিয়েছে ইরান। দেশটির কর্মকর্তারা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের সাফল্যের প্রশংসা করলেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হুথিরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয়। একই সঙ্গে রিয়াদের সঙ্গে হুথিদের আলোচনা পুনরায় শুরু এবং ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে তেহরান।

ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের শিকড় অনেক পুরনো। ২০১৪ সালে হুথিরা দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়। এর পরের বছর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরব। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বড় ধরনের লড়াই বন্ধ হলেও চলতি মাসে হুথিদের নতুন অগ্রযাত্রার পর আবার সংঘাত তীব্র হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর এটিই সবচেয়ে গুরুতর লড়াই বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কোনো পক্ষের জয় বা পরাজয়ের সম্ভাবনা কম। সরকারি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজনও হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ইয়েমেনে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

আরও