পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জলপাই চুরি করছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা

‘জলপাইয়ের জন্য আমরা রক্ত দিচ্ছি’

অধিকৃত পশ্চিম তীরে কয়েক দশক ধরেই জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ফিলিস্তিনিদের ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছেন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। তবে চলতি বছর সহিংসতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি জলপাই চুরির ঘটনাও আগের যেকোনো মৌসুমকে ছাড়িয়ে গেছে। এ তথ্য জানিয়েছেন ফিলিস্তিনিরা, ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘের কর্মকর্তারা

আহমেদ সালেমের যত্নে বেড়ে ওঠা জলপাইগাছ থেকে লাঠি দিয়ে ফল পেড়ে নিয়ে গেছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। ঘটনাটি স্মরণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এ ফিলিস্তিনি কৃষক। বাধা দিতে গেলে হামলার শিকার হতে পারেন—এমন আশঙ্কায় কিছুই করতে পারেননি সালেম।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে কয়েক দশক ধরেই জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ফিলিস্তিনিদের ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছেন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। তবে চলতি বছর সহিংসতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি জলপাই চুরির ঘটনাও আগের যেকোনো মৌসুমকে ছাড়িয়ে গেছে। এ তথ্য জানিয়েছেন ফিলিস্তিনিরা, ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘের কর্মকর্তারা।

প্রায় দুই সপ্তাহ আগে লুব্বান আল-গারবি গ্রামের কাছে সালেমের জলপাই বস্তায় ভরে নিয়ে যায় বসতি স্থাপনকারীরা। তেল তৈরির জন্য ফলগুলো কাছের একটি বসতিতে নিয়ে যায় ইসরায়েলি সেটলাররা।

৫০ বছর বয়সী সালেম বলেন, ‘আপনার নিজের কোনো কিছুর ওপর অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করছে, অথচ আপনি কিছুই করতে পারছেন না—এমন হলে আপনার কেমন লাগবে?’

ওই বসবাস করা এক ইসরায়েলি দম্পতির কাছে রয়েছে জলপাই ভাঙানোর ঘানি। তারা পশ্চিম তীরের জলপাই প্রক্রিয়াজাত করার জন্য অন্য ইসরায়েলিদেরও এটি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। এ বিষয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি। এমনকি পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিগুলোর তদারককারী ইয়েশা কাউন্সিলও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি।

আগামী সপ্তাহে ইসরায়েলের নির্বাচন সামনে রেখে চুরি ও হামলার ঘটনা বেড়েছে। জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, বিরোধীদের কাছে পরাজিত হতে পারে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার বসতি স্থাপনপন্থী জোট। বিরোধীরা বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিষয়ে তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

হামলা ও জলপাই চুরির পাশাপাশি বাগানে আগুনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে সম্প্রতি। ছবি: রয়টার্স

বসতি স্থাপনকারীদের যাতায়াত অবাধ

ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাহাড়ের ঢালে জলপাই বাগানের পরিচর্যা করে আসছে। আবহাওয়া শীতল হতে শুরু করলে এসব বাগান থেকে ফল সংগ্রহের মৌসুমের সূচনা হয়। আর এ বাগানগুলো ফিলিস্তিনিদের পারিবারিক স্মৃতি ও বিনোদনেরও উৎস।

সালেম বলেন, ‘আমার ছয় বছর বয়সী ছেলে মনে করতে পারে, সে আমার সঙ্গে সেখানে যেত, জলপাইবাগানে খেত এবং চা বানাত।’

২০২২ সাল থেকে নেতানিয়াহু সরকারের আমলে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলিদের শত শত ছোট বসতি গড়ে উঠেছে। এসব বসতির আশপাশের এলাকায় ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে সামরিক বাহিনীর বিধিনিষেধও বেড়েছে। এর মধ্যে অনেক জলপাইবাগান রয়েছে।

ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন ইয়েশ দিনের নির্বাহী পরিচালক জিভ স্টাল বলেন, ‘এর ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বসতি ও ফাঁড়ির কাছাকাছি জমিতে ফিলিস্তিনিরা প্রবেশ করতে ও গাছের ফল সংগ্রহ করতে পারেন না। কিন্তু বসতি স্থাপনকারীরা অবাধে যাতায়াত করতে পারেন। তারা সেটাই করছেন।’

ইয়েশ দিন গত বুধবার জানায়, জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শুরুর পর ২৪ দিনে ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর ১২৫টি শারীরিক হামলা এবং ফসল চুরির ১৬৮টি ঘটনা ঘটেছে। অন্তত এক-চতুর্থাংশ ঘটনায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেছেন, সহিংসতা, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার প্রচেষ্টাকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন। তবে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা কিংবা সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিতে জলপাই চুরির অভিযোগ নিয়ে তিনি মন্তব্য করেননি।

হয় আমরা থাকব, নয়তো আমাদের শত্রু

২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সালেমের গ্রামের আশপাশের শত শত একর জমি বেড়া দিয়ে ঘিরে দখলে নিয়েছে কাছের পাহাড়ে গড়ে উঠে আভিচাই ফার্ম নামের ইসরায়েলি বসতি। দখলকৃত এলাকার মধ্যে জলপাইবাগানও রয়েছে।

সালেম বলেন, দখল করা জমির জলপাই সংগ্রহ করে ফাঁড়ির ঘানিতে নিয়ে যেতে দেখেছেন গ্রামবাসীরা। জলপাই সংগ্রহের মৌসুমের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসরায়েলিদের পশ্চিম তীর থেকে জলপাই সংগ্রহ করে আভিচাই ফার্মের ঘানিতে নেয়ার আহ্বান জানানো হয়।

বসতি স্থাপনকারীদের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের বার্তায় লেখা হয়, ‘উন্নত মানের তেল এবং আমাদের ভূমির বিস্তীর্ণ এলাকায় ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণ আরো শক্তিশালী করা—দুটিই লাভ! হয় আমরা থাকব, নয়তো আমাদের শত্রু!’

আভিচাই ফার্মের ঘানিতে তৈরি জলপাই তেল বোতলপ্রতি প্রায় ২০ ডলারে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে। বসতি স্থাপনকারীদের সংগঠন ফার্মস অ্যাসোসিয়েশনের ওয়েবসাইটে এসব পণ্যকে ‘উন্নত মানের’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটি ইসরায়েল সরকারের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা পায় বলে এর আগে জানিয়েছে রয়টার্স। সংগঠনটি বলেছে, তাদের লক্ষ্য শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা।

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও অধিকাংশ দেশ মনে করে, যুদ্ধে দখল করা ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ। তবে ইসরায়েল এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে অঞ্চলটিকে অধিকৃত নয়, বরং বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে।

চলতি বছরের জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। এসব হামলায় কয়েকজন সাংবাদিক, ইউরোপীয় কূটনীতিক ও ফ্রান্সের এক মেয়রও আহত হয়েছেন।

ইয়েশ দিনের জিভ স্টাল বলেন, এই সহিংসতা ‘জাতিগত নিধন অভিযানের অংশ, যার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণকে ছাড়াই পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার পথ তৈরি করা হচ্ছে।’ তবে ইসরায়েল জানিয়েছে তারা কিছু ঘটনার তদন্ত করছে।

ফিলিস্তিনি কৃষক সামের বেন শামসি জানান, গত ৯ অক্টোবর নাবলুসের কাছে বেইতা গ্রামে মুখোশধারী বসতি স্থাপনকারীরা তার ওপর হামলা চালান। অন্য কৃষকসহ পালিয়ে এলে হামলাকারীরা পিকআপে করে তাদের জলপাই নিয়ে চলে যায়।

নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি ইঙ্গিত করে বেন শামসি বলেন, ‘এ বছর তারা নির্ভয়ে জলপাই চুরি করছে। কারণ তাদের পেছনে রাষ্ট্র ও শক্তিশালী বাহিনীর সমর্থন রয়েছে।’

গত এক বছরেই বসতি স্থাপনকারীরা তার পায়ে গুলি করেছে, মারধর করেছে এবং জিনিসপত্র ভাঙচুর করেছে বলেও জানান তিনি।

বেন শামসির কথায়, ‘জলপাইয়ের জন্য আমরা রক্ত দিচ্ছি।’

আরও